15/07/2020
শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। সেই ছোটো বেলা
থেকে শুনে আসছি। আজ শিক্ষকতা করতে এসে
নিজেকে প্রশ্ন করি- এই জাতির মেরুদণ্ড কতটা
মজবুত হয়েছে ! কতটা শক্ত ভিতের উপর এটা
স্থাপিত !
শিক্ষা হচ্ছে যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর জ্ঞান,
দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, চরিত্রের বিকাশ
ও উন্নয়ন ঘটিয়ে তার দৈহিক, মানসিক, নৈতিক,
আধ্যাত্মিক বিকাশ সম্ভব তাকে বুঝায়। শব্দ
তত্ত্বের দিক থেকে বিচার করলে এটি সংস্কৃত
‘শাসা’ ধাতু থেকে এসেছে। যার অর্থ- শাসন,
নির্দেশ, তিরস্কার, শক্তি প্রদান ইত্যাদি।
আবার এর ব্যুৎপত্তি দিক বিচার করলে শিক্ষা
বলতে বিশেষ জ্ঞানার্জন বা কোনো দক্ষতা
অর্জন করাকে বলা হয়। শিক্ষা শব্দের ইংরেজি
‘Education’। যেটা নির্দেশ করে- শিক্ষাদান,
প্রশিক্ষণ, প্রতিপালন বা পরিচর্যা করা এবং
নানাগুণাবলির সমাবেশ ঘটিয়ে ভেতর থেকে
পরিবর্তন সাধন করাকে।
শিক্ষাকে আমরা সংকীর্ণ এবং ব্যাপক এই দুই
অর্থে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। ব্যাপক অর্থে
বলতে গেলে জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে মানুষ যে
নতুন নতুন অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করে সেটাই
শিক্ষা। আর সংকীর্ণ অর্থে আমরা প্রচলিত
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বুঝি। কোনো দেশের
সংস্কৃতি, সামাজিক অবস্থা, ভৌগোলিক, ধর্মীয়
এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর নির্ভর করে
গড়ে উঠে সেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা । যা এক
যুগের সঞ্চিত জ্ঞান অন্য যুগে স্থানান্তর করে।
যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যত সুসংগঠিত সেই
দেশ তত উন্নত।
আমাদের দেশে প্রধানত তিন ধরণের শিক্ষা
ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। সেগুলো হলো- সাধারণ
শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং ইংরেজি
মাধ্যমে শিক্ষা। এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও
সনাতনীই রয়ে গেছে। এতে ঔপনিবেশিক ও
পাকিস্তান আমলের ছাপ স্পষ্ট। দেশের বিভিন্ন
স্থানে এমনকি গ্রাম-গঞ্জের আনাচে-কানাচে
গড়ে তোলা হচ্ছে কিন্ডার গার্ডেন স্কুল,
সেখানে পড়ার মান যেমনই হোক না কেনো
শিক্ষার্থীরা ব্যাগের ভারে ন্যুব্জমান। ইংলিশ
মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি
বিদেশী ধাঁচের। মাদ্রাসা শিক্ষায় সাধারণ
শিক্ষার পাশাপাশি মুসলমান শিক্ষার্থীদের
ইসলামি শিক্ষা দেয়া হয়। সাধারণ শিক্ষায়
রয়েছে ব্যাপক অসংগতি! মাধ্যমিক স্তরে
শিক্ষার্থীগণ বিজ্ঞান, মানবিক এবং ব্যবসায়
শিক্ষা এই তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায়। উচ্চ
মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে
চাপে বিষয় পছন্দের বোঝা আর এই বোঝাকে
হালকা করতে চালু করা হলো গুচ্ছ পদ্ধতি। এর
খেসারত দিয়ে চলেছেন অনেক শিক্ষক। তাঁদের
বিষয়ের শিক্ষার্থী সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন কারণে বিজ্ঞান শিক্ষায়
শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে বিজ্ঞানে
শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের
সাইন্স ফ্যাকাল্টির একজন জনপ্রিয় শিক্ষক
আফসোস করে বলেছিলেন, ‘আমরা যখন সন্ধ্যা
পর্যন্ত প্র্যাক্টিকাল ক্লাশ করতাম, রাত জেগে
খাতা লিখতাম তখন আর্টস ফ্যাকাল্টির ছাত্ররা
টিএসসিতে আড্ডা মারতো। বাপের কত টাকা
বেশি খরচ করেছি! ওদের চেয়ে যদি দশটা টাকাও
বেতন বেশি পেতাম তাওতো মনে শান্তি হতো।’
সৃজনশীল পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয় শিক্ষার্থীদের
পাঠ্যবই পড়ে আত্মজ্ঞান প্রকাশ, চিন্তন দক্ষতা
বৃদ্ধি এবং গাইড, নোটবই, কোচিং বিলুপ্তির
লক্ষ্য নিয়ে। নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ কিন্তু
অদূরদর্শিতার কারণে পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই
পদ্ধতিটি চালু হয়ে যায়। তাই এর উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ
ব্যর্থতায় পর্যবসিত। নতুন একটা পদ্ধতি,
শিক্ষকদের ট্রেনিং নাই! কোনো ধারনাও নাই!
শিক্ষার্থীরা বাজারে সৃজনশীলের গাইড বই
খোঁজ করতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন পাবলিকেশন
চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে বাজার সয়লাব করে
ফেলে গাইড, নোটবই দিয়ে। এমন কি তারা
শিক্ষকদেরও সৌজন্য কপি পৌছে দেয়। আমি
নিজেই সৃজনশীল ট্রেনিং পাওয়ার আগে
প্রশ্নপত্র তৈরি করতে গিয়ে অথৈ সাগরে
পড়েছিলাম। এখনও সকল শিক্ষক ট্রেনিং পাননি।
অথচ একের পর এক বিষয় সৃজনশীল হয়েই চলেছে।
জানিনা এদেশের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের
আর কত বার গিনিপিগ হতে হবে!!!