18/11/2025
◆ মেয়ের বাবাদের লজ্জা থাকতে নেই? — হৃদয় ভাঙা এক বাস্তব গল্প
◆ বাবা দরজায় দাঁড়িয়ে…
দরজার ঘণ্টা বাজতেই খুলে দেখি—
আমার জন্মদাতা বাবা দাঁড়িয়ে আছে।
মুখে সেই চিরচেনা হাসি,
আর হাতে ছোট্ট একটা বক্স।
আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললাম—
“বাবা, ভিতরে আসো…”
ভিতরে এসে বক্সটা বাড়িয়ে দিয়ে বাবা বললো—
“এই নে মা, তোর পছন্দের গুড়ের পায়েস। তোর মা বানিয়েছে। তোকে না খাইয়ে আমরা কীভাবে খাবো?”
আমি অবাক হয়ে বললাম—
“এসব দিতে ৬০ কিলোমিটার পথ আসলে?”
বাবা আবারো হাসলো।
একটা অদ্ভুত, শান্ত, ক্লান্ত হাসি।
◆ শ্বাশুড়ির আচরণ…
ঠিক তখনই রুমের ভেতর থেকে শ্বাশুড়ির ডাক—
“বউমা, কে এসেছে?”
বাবা এগিয়ে গিয়ে ভদ্রভাবে বললো—
“কেমন আছেন বেয়ান সাব?”
শ্বাশুড়ি একবার তাকিয়ে কোনো উত্তর না দিয়েই
রুমে চলে গেলেন।
সেই নীরবতাই ছিল বাবার প্রতি তার প্রথম অপমান।
◆ বাবাকে থাকতে দিতে পারলাম না…
বাবা বললো—
“মা, আজ থাকি একদিন? তোমাদের সাথে একটু সময় কাটাই।”
আমি কান্না চেপে রাখতে রাখতে বললাম—
“না বাবা… দুপুরের পর চলে যাও।”
আমার নিজের মুখের কথায়
যেন বুকের ভেতর কাঁচ ভেঙে গেলো।
◆ শ্বাশুড়ির রাগ—“তোমার বাপের লজ্জা নাই!”
আমি শ্বাশুড়ির রুমে গিয়ে বললাম—
“মা, খাসির মাংসটা বের করি? বাবা খেয়ে যাবে…”
তিনি রাগী গলায় বললেন—
“এত আপ্যায়ন লাগবে না! তোমার বাপ তো রোজ রোজ এসে পড়ে! তার জন্য আবার খাসি রান্না করতে হবে?
লোকটার লজ্জা নেই নাকি?”
আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম—
“মা, পাশের রুমে বাবা আছে… দয়া করে এসব বলবেন না।”
আমি সরে আসলাম।
চোখের পানি থামাতে পারলাম না।
◆ জামাইয়ের অপমান—বাজারের ব্যাগ হাতে তুলে দেওয়া…
একবার স্বামী বাজারের ব্যাগ দিয়ে বাবাকে বলেছিল—
“আপনি তো ফ্রি আছেন, বাজারটা করে নিয়ে আসুন।”
একজন শ্বশুরের জন্য এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হতে পারে?
কিন্তু বাবা কিছুই বুঝলো না।
হাসিমুখে বাজারে চলে গেলো।
◆ দুপুরের খাবার—মাছের মাথাটাও বাবাকে দিতে পারলাম না… খাওয়া পরিবেশন করতে গিয়ে
মাছের মাথাটা বাড়িয়ে দিচ্ছিলাম বাবার প্লেটে।
হঠাৎ শ্বাশুড়ি এসে বললেন—
“এটা আমার ছেলের জন্য! নিজের বাপকে মাছের মাথা দিচ্ছো কেন?”
বাবা চুপচাপ ঝোল মেখে খেতে লাগলো।
বললো—
“তুই এত ভালো রান্না করিস! বাড়ি গিয়ে তোর মাকে শেখাবি একদিন।”
বাবার সরল কথাগুলো তখন ছুরি হয়ে বিঁধলো আমার মনে।
◆ অবশেষে বাবাকে নিষেধ করলাম…
খাওয়া শেষে বাবা উঠতেই
আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম।
বললাম—
“বাবা, প্লিজ… আর আসবে না এই বাড়িতে।
তোমাকে বারবার অপমান করতে আমার খারাপ লাগে!”
বাবা কিছু বললো না।
শুধু আমার মাথায় হাত রেখে
হাসিমুখে চলে গেলো।
সেই দিনের পর বাবা আর কখনো আমাদের বাড়ি আসেনি।
◆ অথচ বিপদের সময়ে সবার পাশে ছিল বাবা…
শ্বাশুড়ি অসুস্থ হলো,
স্বামীর ব্যবসা খারাপ হলো—
সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল আমার বাবা।
কিন্তু তবুও…
কখনো আমাদের বাসায় আসেনি।
◆ দুই বছর পর—আমি মা হলাম
মেয়ে হওয়ার পর
আমার স্বামী বদলে গেলো।
রাতে ঘুম না হলে
ঘন্টার পর ঘন্টা কোলে নিয়ে হাঁটে।
মেয়ে আধো গলায়
“বাবা…”
বলে ডাকলে
স্বামী খুশিতে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
একদিন মেয়েকে বুকে নিয়ে বললো—
“আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দেবো না! সারাজীবন রাখবো!”
আমি শান্তভাবে বললাম—
“আমার বাবাও আমাকে ঠিক এভাবেই ভালোবাসতো।
তবুও আমাকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল।
আর যখন আমি বিয়ার পর তোমার বাসায় এলাম—
প্রতিবার অপমানিত হয়েও বাবা আসতো…
শুধু আমাকে এক নজর দেখার জন্য।”
স্বামী চুপ করে গেলো।
◆ স্বামীর উপলব্ধি—"মেয়ের বাবা হলে লজ্জা থাকতে নেই"
পরদিন সকালে দেখি স্বামী ল্যাগেজ গুছিয়ে বসে আছে।
বললাম—
“কোথায় যাবে?”
স্বামী মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললো—
“মেয়ের বাবা হিসেবে দায়িত্ব শিখতে…
তোমার বাবার কাছে যাচ্ছি।
কারণ ওনার মতো সহ্যশক্তি আমার নেই।
আমিও শিখতে চাই—
মেয়ের বাবাদের লজ্জা থাকতে নেই কেন।”
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।
একজন ত্রিশোর্ধ মানুষ
নিজের ভুলের জন্য
এতোটা অনুতপ্ত হতে পারে—
সেটা প্রথমবার দেখলাম।
সেদিনের পর স্বামীর প্রতি
আমার কোনো অভিযোগই আর রইলো না।
◆ কারণ সত্যিটা শুধু একটাই…
একজন বাবা যতটা ভালোবাসে মেয়েকে,
তার তুলনা পৃথিবীর কোনো বন্ধনেই নেই।
মেয়ের জন্য বাবারা
নির্লজ্জ হয়,
অপমান সহ্য করে,
দূরত্ব পাড়ি দেয়,
আর বারবার ভেঙে পড়ে—
শুধু মেয়ের হাসিটা দেখার জন্য।