Mufti Waliullah AL-Jami

Mufti Waliullah AL-Jami ইসলামিক আলোচক

12/05/2026
12/05/2026
23/02/2026

ধৈর্য ও সদাচরণঃ

রমজানে মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মানুষের সাথে ভালো ব্যবহারের গুরুত্বঃ
রমজান মাস কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়, বরং এটি নিজের নফস বা প্রবৃত্তি দমনের এক মহত্তম প্রশিক্ষণ। সারাদিন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকার ফলে শরীরে ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক, আর এই ক্লান্তি থেকে অনেক সময় আমাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। কিন্তু রমজানের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে সেই ধৈর্য ও সদাচরণের মধ্যে।
রমজানে মেজাজ নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের সাথে ভালো ব্যবহারের গুরুত্ব নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলোঃ—
১. রোজা কেবল পেটের নয়, জিহ্বা ও মনেরও
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ ত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই”। অর্থাৎ, রোজা রেখেও যদি আমরা অন্যের সাথে খারাপ ব্যবহার করি বা মেজাজ হারিয়ে গালিগালাজ করি, তবে সেই রোজার আধ্যাত্মিক কোনো মূল্য থাকে না।
২. মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল
ক্ষুধা ও ঘুমের স্বল্পতার কারণে মেজাজ গরম হওয়া একটি মানবিক প্রতিক্রিয়া। তবে মুমিন হিসেবে আমাদের এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে:
★ চুপ থাকাঃ রেগে গেলে কথা না বলে চুপ হয়ে যাওয়া সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
★ অজু করাঃ রাগ আগুনের মতো, আর পানি সেই আগুন নিভিয়ে দেয়।
★ অবস্থান পরিবর্তনঃ দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়া, আর বসে থাকলে শুয়ে পড়া।
৩. “আমি রোজা রেখেছি” - এই মূলমন্ত্র
হাদিসে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, যদি কেউ রোজা রাখা অবস্থায় ঝগড়া করতে আসে বা গালি দেয়, তবে তার প্রতিউত্তরে শুধু বলতে— "আমি রোজা রেখেছি।" এটি নিজের মেজাজ শান্ত রাখার পাশাপাশি অন্যকেও একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়।
৪. সদাচরণ ও নেকির পাল্লাঃ
রমজান মাসে প্রতিটি ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এ মাসে মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলা, অসহায়কে সাহায্য করা এবং অধিনস্তদের প্রতি সদয় হওয়া বিশাল সওয়াবের কাজ।
★ পরিবারে সময় দেওয়াঃ সারাদিন কাজের পর ঘরে ফিরে পরিবারের সদস্যদের সাথে ধৈর্যশীল আচরণ করাও ইবাদত।
★ কর্মক্ষেত্রে সহনশীলতাঃ সহকর্মী বা কর্মচারীদের কাজের চাপ কিছুটা কমিয়ে দেওয়া রমজানের অন্যতম শিক্ষা।

ধৈর্য ও সদাচরণের সুফলঃ
★ আত্মিক শান্তিঃ মেজাজ শান্ত রাখলে মনে প্রশান্তি অনুভূত হয়।
★ সামাজিক বন্ধনঃ ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায়।
★ গুনাহ মাফঃ সহনশীলতা আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার পথ প্রশস্ত করে।
মনে রাখবেন— রমজান আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজেকে শান্ত রাখতে হয়। এই এক মাসের প্রশিক্ষণ যেন আমাদের বছরের বাকি ১১ মাসও ধৈর্যশীল ও বিনয়ী থাকতে সাহায্য করে।

রমজানে শারীরিক ক্লান্তির মাঝেও মেজাজ ফুরফুরে রাখা এবং ধৈর্য বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বৈজ্ঞানিক এবং আধ্যাত্মিক—উভয় দিক থেকেই কিছু কৌশলী রুটিন অনুসরণ করলে এটি অনেক সহজ হয়ে যায়।
আপনার জন্য কার্যকরী কিছু টিপস নিচে দেওয়া হলো—

১. সেহরিতে পুষ্টিকর খাবারঃ (Physical Balance)
আপনার সারাদিনের মেজাজ কেমন থাকবে, তা অনেকখানি নির্ভর করে আপনি সেহরিতে কী খাচ্ছেন তার ওপর।
★ Complex Carbs: সেহরিতে লাল চালের ভাত, ওটস বা রুটি খান। এগুলো ধীরে ধীরে শক্তি দেয়, ফলে হঠাৎ করে সুগার লেভেল কমে গিয়ে মেজাজ খিটখিটে হয় না।
★ হাইড্রেশনঃ ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করুন। পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন রাগের অন্যতম প্রধান কারণ।

২. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাঃ
রমজানে তারাবি এবং সেহরির কারণে ঘুমের স্বাভাবিক রুটিন বদলে যায়। ঘুমের অভাব সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের Amygdala (যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে) অংশকে প্রভাবিত করে।
★ পাওয়ার ন্যাপঃ (Power Nap): দুপুরে বা জোহরের নামাজের পর ১৫-২০ মিনিটের একটি ছোট ঘুম বা বিশ্রাম নিন। এটি মস্তিষ্ককে রিচার্জ করতে দারুণ কাজ করে।

৩. ডিজিটাল ডিটক্সঃ (Digital Detox)
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক বা নেতিবাচক খবর আমাদের বিরক্তির কারণ হয়।
★ রমজানে স্ক্রিন টাইম কমিয়ে দিনঃ অহেতুক তর্কে জড়ানো বা অন্যের জীবন দেখে নিজের মধ্যে অতৃপ্তি তৈরি হওয়া থেকে বিরত থাকুন। এর বদলে কুরআন তিলাওয়াত বা জিকিরে সময় কাটান।

৪. ‘পাঁচ সেকেন্ড’ নিয়মঃ
যখনই অনুভব করবেন আপনার রাগ বাড়ছে বা আপনি কাউকে কড়া কথা বলতে যাচ্ছেন, তখন মনে মনে ৫ থেকে ১ পর্যন্ত উল্টো গণনা করুন। এই ৫ সেকেন্ডের বিরতি আপনার মস্তিষ্ককে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া (Reaction) থেকে সরিয়ে যৌক্তিক চিন্তা (Response) করতে সাহায্য করবে।

৫. শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামঃ
অজু করার পাশাপাশি যখনই মেজাজ গরম হবে, লম্বা করে বুক ভরে শ্বাস নিন এবং ধীরে ধীরে ছাড়ুন। এটি রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়িয়ে আপনার স্নায়ুগুলোকে শান্ত করবে।

মেজাজ নিয়ন্ত্রণে করণীয়ঃ
★ সকালঃ পজিটিভ চিন্তা দিয়ে দিন শুরু করা এবং অতিরিক্ত কাজের চাপ না নেওয়া।
★ দুপুরঃ কাজের ফাঁকে অন্তত ১০ মিনিট নিরিবিলি বিশ্রাম নেওয়া।
★ বিকেলঃ ইফতারের আগের সময়টা খুব নাজুক থাকে, এ সময় জিকির বা তসবিহ পাঠ করা।
★ রাতঃ দ্রুত ঘুমানোর চেষ্টা করা যাতে সেহরিতে উঠলে ক্লান্তি না লাগে।
একটি বিশেষ টিপসঃ আপনি যদি বুঝতে পারেন আপনার রাগ হচ্ছে, তবে সাথে সাথে স্থান ত্যাগ করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী, রেগে গেলে কথা না বলে চুপ হয়ে যাওয়া হলো মেজাজ নিয়ন্ত্রণের সেরা উপায়।

রমজানে সুস্থ থাকা এবং ইবাদতে মনোযোগী হওয়ার জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ রুটিন ও খাবারের তালিকা নিচে দেওয়া হলো। এটি আপনার শরীরে শক্তির জোগান দেবে এবং মেজাজ শান্ত রাখতে সাহায্য করবে।
রমজানের আদর্শ খাবারের তালিকাঃ
খাবারের ক্ষেত্রে মূলমন্ত্র হলো— “পরিমিত আহার ও পর্যাপ্ত পানি”।

১. সেহরিঃ (শক্তি ধরে রাখার জন্য)
সেহরিতে এমন খাবার খাওয়া উচিত যা দীর্ঘ সময় শক্তি দেয় (Complex Carbs) এবং তৃষ্ণা কমায়।
★ খাবারঃ লাল চালের ভাত/ওটস/রুটি, সাথে প্রোটিন হিসেবে মাছ, মুরগি বা ডিম।
★ সবজি ও ডালঃ আঁশযুক্ত সবজি হজমে সাহায্য করে।
★ দই ও কলাঃ কলা পটাশিয়ামের উৎস যা তৃষ্ণা কমায়, আর দই পাকস্থলী ঠান্ডা রাখে।
★ বর্জনীয়ঃ অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার, বেশি মসলা ও চা-কফি (এগুলো শরীরকে ডিহাইড্রেট করে)।

২. ইফতার (তাৎক্ষণিক শক্তি ও আর্দ্রতা)
ইফতারে ভাজাপোড়া কমিয়ে পুষ্টিকর খাবারে মনোযোগ দিন।
★ শুরু করুনঃ ২-৩টি খেজুর ও সাধারণ পানি দিয়ে। খেজুর দ্রুত সুগার লেভেল ঠিক করে।
★ তরলঃ ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা চিনিকম ফলের রস।
★ মূল খাবারঃ পাতলা খিচুড়ি, দই-চিঁড়া বা স্যুপ। বেগুনি-পিয়াজু খুব অল্প পরিমাণে রাখুন।

৩. রাতের খাবারঃ (হালকা ও পুষ্টিকর)
ইফতারের পর ভারী খাবার না খেয়ে তারাবির পর হালকা ডিনার করা ভালো।
★ অল্প ভাত, সবজি এবং পাতলা ডাল। প্রচুর পানি পান করুন ঘুমানোর আগ পর্যন্ত।

রমজানের আদর্শ দৈনিক রুটিনঃ
★ সেহরি ও ফজরঃ সেহরি শেষ করে ফজর পড়ে কিছুক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত। দিনের শুরুটা আধ্যাত্মিক রাখা।
★ সকালঃ (৮টা - ১২টা) অফিস/পড়াশোনা বা প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নেওয়া। শক্তি থাকতে কঠিন কাজগুলো শেষ করা।
★ দুপুরঃ (১টা - ২টা) জোহরের পর ১৫-২০ মিনিটের একটি 'পাওয়ার ন্যাপ' (ঘুম)। মস্তিষ্কের ক্লান্তি দূর করা ও মেজাজ ঠান্ডা রাখা।
★ বিকেলঃ (৪টা - ৬টা) আসরের পর জিকির, দোয়া বা ঘরের হালকা কাজ। ইফতারের আগের সময়টা ধৈর্য ধরা।
★ ইফতার ও মাগরিবঃ পরিবারসহ ইফতার করা ও ধীরস্থিরভাবে নামাজ পড়া। শরীর ও মনে প্রশান্তি আনা।
★ রাতঃ (৮টা - ১০টা) এশা ও তারাবি নামাজ আদায় করা। শরীরকে সচল রাখা ও ইবাদতে মশগুল হওয়া।
★ রাতঃ (১১টা) দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া। সেহরিতে ফ্রেশ হয়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম।

মেজাজ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পরামর্শঃ
★ গ্যাপ বজায় রাখুনঃ ইফতারে একবারে অনেক বেশি খেয়ে ফেলবেন না। এতে অলসতা ও মেজাজ খিটখিটে হতে পারে।
★ কাজের চাপঃ দিনের কঠিন কাজগুলো দুপুরের আগেই শেষ করার চেষ্টা করুন, কারণ বিকেলের দিকে এনার্জি কমে যায়।
★ দোয়াঃ ইফতারের আগের সময়টি দোয়া কবুলের সময়। রাগ বা বিরক্তি না দেখিয়ে এ সময়টি দোয়ায় ব্যয় করুন।

ওয়ালি উল্লাহ আল জামী

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Mufti Waliullah AL-Jami posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share