09/10/2025
শিশুদের স্ক্রিন টাইম: মস্তিষ্কের ওপর কতটা প্রভাব? 🤔
স্ক্রিন টাইম নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ নতুন নয়, কিন্তু এটি শিশুদের মস্তিষ্কে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলে? বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা এই নিয়ে বিতর্ক করছেন।
বিশ্বখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী ব্যারোনেস সুসান গ্রিনফিল্ডের মতে, ইন্টারনেট ও কম্পিউটার গেম কিশোরদের মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে। তিনি একে একসময় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ের সাথেও তুলনা করেছিলেন।
বিজ্ঞান যা বলছে
তবে, অনেক বিজ্ঞানীই এই দাবির সাথে একমত নন:
প্রমাণের অভাব: ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিনফিল্ডের দাবিগুলো "প্রমাণভিত্তিক নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে ছিল না"।
মানসিক স্বাস্থ্যে সামান্য প্রভাব: আমেরিকান সাইকোলজি অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক বিশ্লেষিত ৩৩টি গবেষণা অনুসারে, স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া ও ভিডিও গেমের মতো স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় খুব সামান্যই ভূমিকা রাখে।
ঘুমের বিষয়ে নতুন তথ্য: যদিও ব্লু লাইট মেলাটোনিন (ঘুমের হরমোন) দমন করতে পারে বলে মনে করা হয়, তবে ২০২৪ সালের ১১টি গবেষণার এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঘুমের আগের এক ঘণ্টা স্ক্রিনের আলো ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়—এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।
মনোবিজ্ঞানীর মত: বাথ স্পা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিট এটচেলস, যিনি বহু গবেষণা বিশ্লেষণ করেছেন, তার মতে, "স্ক্রিন টাইমের ভয়াবহ ফলাফল নিয়ে যেসব গল্প বলা হয়, তা সমর্থন করার জন্য যথাযথ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আসলে নেই।" তিনি বলেন, বিষণ্নতা বা উদ্বেগের মূল কারণ হতে পারে একাকীত্ব, শুধুমাত্র স্ক্রিন টাইম নয়।
স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ
স্ক্রিন 'মস্তিষ্ককে নতুনভাবে গঠন' করে? অধ্যাপক এটচেলস বলেন, "সবকিছুই মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে, এভাবেই মানুষ শেখে।"
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী ১১,৫০০ শিশুর ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা যায়, স্ক্রিন ব্যবহারের ধরনে মস্তিষ্কের সংযোগে পরিবর্তন এলেও, এর ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি বা বুদ্ধিগত সমস্যার কোনো প্রমাণ মেলেনি।
অধ্যাপক ক্রিস চেম্বার্স বলেন, "যদি মস্তিষ্কের অবনতি ঘটত, তাহলে সেটা স্পষ্টভাবে বোঝা যেত। গত ১৫ বছরের গবেষণাগুলো দেখলেই সেটা ধরা পড়ত।"
চিন্তার বিষয়: 'নিষিদ্ধ ফল' 🍎
অ্যাপলের সাবেক সিইও স্টিভ জবস এবং বিল গেটসও নিজেদের সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমারেখা টেনে দিয়েছিলেন।
কেউ কেউ মনে করেন, স্ক্রিন টাইম যত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা স্ক্রিনকে 'নিষিদ্ধ ফলের' মতো আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে, সান ডিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জিন টোয়েনজি মনে করেন, ১৬ বছরের আগে স্মার্টফোন থেকে শিশুদের দূরে রাখা উচিত, কারণ এ সময় তাদের মস্তিষ্ক বেশি পরিপক্ব ও বিকশিত হয়।
ডেনমার্কের এক গবেষণায় স্ক্রিন টাইম কমানোয় শিশু-কিশোরদের মানসিক উপসর্গ ও আচরণে ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে।
তাহলে কী করবেন অভিভাবকরা?
বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনা নেই। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস বা যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব পেডিয়াট্রিকস কোনো নির্দিষ্ট স্ক্রিন টাইম বেঁধে দেয়নি (যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক বছর বয়স পর্যন্ত স্ক্রিন টাইম 'না' এবং চার বছর পর্যন্ত দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা বলেছে)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলোচনায় পক্ষপাত ও দোষারোপ না করে, বরং শিশুর অভিজ্ঞতা ও প্রকৃতির ওপর গুরুত্ব দিন। একা বা নেতিবাচক খবর দেখা (ডুমস্ক্রলিং) যেমন ক্ষতিকর হতে পারে, তেমনি বন্ধুদের সাথে অনলাইন যোগাযোগ বা শিক্ষামূলক কনটেন্ট হতে পারে উপকারী।
আসুন, জাজমেন্টাল না হয়ে, সন্তানের স্ক্রিন ব্যবহারের ধরন এবং সামগ্রিক সুস্থতার দিকে মনোযোগ দিই। প্রযুক্তির ব্যবহার হয়তো আটকানো যাবে না, কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।
আপনার সন্তানের স্ক্রিন টাইম নিয়ে আপনার ভাবনা কী? কমেন্টে জানাতে পারেন! 👇
#স্ক্রিন_টাইম #শিশুদের_স্বাস্থ্য #মস্তিষ্ক #অভিভাবকত্ব #প্রযুক্তি #ডিজিটাল_সুস্থতা