10/01/2026
জানেন কি? এই মুহূর্তে আপনার চারপাশে এমন কিছু আছে যা আপনি দেখতে পারছেন না, ছুঁতে পারছেন না, কিন্তু সেটাই নিয়ন্ত্রণ করছে পুরো মহাবিশ্ব? শুনতে অবিশ্বাস্য লাগছে? কিন্তু এটাই বাস্তব। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো আমাদের পদার্থবিজ্ঞান, যে বিজ্ঞান আমাদের চাঁদে পৌঁছে দিয়েছে, পরমাণু ভেঙেছে, সেই বিজ্ঞানও এর সামনে সম্পূর্ণ অসহায়। আজ আমরা জানবো সেই ভয়ংকর সত্য, যা হয়তো আপনার রাতের ঘুম কেড়ে নেবে। হা হা_____
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা দেখি সূর্য উঠছে। রাতে তাকাই আকাশে, দেখি অগণিত তারা জ্বলছে। আমরা ভাবি, আমরা সবকিছু বুঝি। কিন্তু সত্য হলো, আমরা কিছুই জানি না। আপনি যদি ভাবেন এই চকচকে তারাগুলো, এই বিশাল গ্যালাক্সিগুলো, এই গ্রহ-উপগ্রহগুলোই মহাবিশ্বের পুরোটা, তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। চরম ভুল।
বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, আমরা যা কিছু দেখি—আমাদের পৃথিবী, সূর্য, সব তারা, সব গ্যালাক্সি এগুলো মহাবিশ্বের মাত্র পাঁচ শতাংশ! হ্যাঁ, মাত্র পাঁচ শতাংশ। তাহলে বাকি পঁচানব্বই শতাংশ কোথায়? কী আছে সেখানে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে মেধাবী মস্তিষ্কগুলো আজও হাতড়ে বেড়াচ্ছে অন্ধকারে। এবং এই অন্ধকার শুধু রূপক অর্থে নয়, আক্ষরিক অর্থেই অন্ধকার।
গল্পটা শুরু হয় ১৯৩০-এর দশকে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিটজ জুইকি মহাকাশে গ্যালাক্সিগুলোর গতি পরিমাপ করছিলেন। তিনি একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলেন, গ্যালাক্সিগুলো যে গতিতে ঘুরছে, সেই গতিতে তাদের ছিটকে যাওয়ার কথা। কিন্তু তারা ছিটকে যাচ্ছে না। কেন? কারণ সেখানে এমন কিছু আছে যা তাদের ধরে রাখছে। কিন্তু সেই কিছুকে দেখা যাচ্ছে না।
জুইকি নাম দিলেন 'ডার্ক ম্যাটার' বা অন্ধকার পদার্থ। এটা কোনো কালো রঙের পদার্থ নয়। এটা 'ডার্ক কারণ এটা কোনো আলো প্রতিফলিত করে না, শোষণও করে না। এটা অদৃশ্য। আমরা এর মধ্য দিয়েই হেঁটে যাচ্ছি প্রতিদিন কিন্তু তা টের পাচ্ছি না। এই ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের প্রায় সাতাশ শতাংশ।
কিন্তু আরও বড় রহস্য বাকি আছে। ১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা আরেকটি চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার করেন। তারা দেখলেন মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না বরং ক্রমাগত দ্রুততর হারে প্রসারিত হচ্ছে। এটা হওয়ার কথা ছিল না। মহাকর্ষ তো টানে, ঠেলে না। তাহলে কে ঠেলছে মহাবিশ্বকে? উত্তর একটাই 'ডার্ক এনার্জি'। এই রহস্যময় শক্তি মহাবিশ্বের আটষট্টি শতাংশ।
চিন্তা করে দেখুন। আমাদের সমস্ত বিজ্ঞান, সমস্ত জ্ঞান, সমস্ত আবিষ্কার—সবকিছু মিলে আমরা জানি মহাবিশ্বের মাত্র পাঁচ শতাংশ সম্পর্কে। বাকি পঁচানব্বই শতাংশ সম্পূর্ণ অজানা। এটা এমন যেন আমরা একটা বিশাল অন্ধকার সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে, আর ভাবছি আমরা সব জানি কারণ আমরা পানিতে পা ডুবিয়েছি।
কিন্তু রহস্য শুধু এখানেই শেষ নয়। আরও গভীরে যান। এবার কথা বলি মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস নিয়ে, যার নাম ব্ল্যাক হোল। ব্ল্যাক হোল এতটাই ঘন যে এর মহাকর্ষ থেকে এমনকি আলোও পালাতে পারে না। কিন্তু এর ভেতরে কী হয়? পদার্থবিজ্ঞানের সমস্ত নিয়ম সেখানে ভেঙে পড়ে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলে সেখানে স্থান-কাল বিকৃত হয়ে যায়। কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে অন্য কথা। দুটোই সঠিক, কিন্তু দুটো একসাথে কাজ করে না। বিজ্ঞান সেখানে নীরব।
আরও পেছনে যান। সাড়ে তেরো বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাং হয়েছিল। সেই বিস্ফোরণ থেকেই আজকের মহাবিশ্ব। কিন্তু তার ঠিক আগের মুহূর্তে কী ছিল? পদার্থবিজ্ঞানের কোনো সমীকরণ সেখানে কাজ করে না। স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, বিগ ব্যাংএর আগে কী ছিল জিজ্ঞাসা করা মানে উত্তর মেরুর উত্তরে কী আছে জিজ্ঞাসা করার মতো—প্রশ্নটাই অর্থহীন। কিন্তু আমাদের মন তো প্রশ্ন করতেই থাকে।
এখন আসি আরও কাছে, আপনার কাছে। আপনার চেতনা। আপনি এই মুহূর্তে এই কথাগুলো শুনছেন, বুঝছেন, ভাবছেন। কীভাবে? মস্তিষ্কের নিউরনে ইলেকট্রিক সিগন্যাল চলছে। কিন্তু সেই সিগন্যাল কীভাবে 'অনুভূতি' হয়ে যাচ্ছে? কীভাবে 'আমি' তৈরি হচ্ছে? একটা মৃত আর জীবিত শরীরের মধ্যে পদার্থগত পার্থক্য প্রায় নেই। তাহলে 'জীবন' কী? চেতনা কী? পদার্থবিজ্ঞান এর উত্তর দিতে পারে না। নিউরোসায়েন্সও পারে না।
তাহলে প্রশ্ন হলো—এই সব রহস্যের উত্তর কী? কেউ কেউ বলেন, এগুলো বৈজ্ঞানিক সমস্যা। সময়ের সাথে সাথে আমরা এর উত্তর পাব। হয়তো পাব। কিন্তু আরেক দল বলেন, এই রহস্যগুলো হয়তো এমন কিছুর দিকে ইঙ্গিত করছে যা পদার্থবিজ্ঞানের সীমানার বাইরে।
দেখুন মহাবিশ্বের সূক্ষ্ম-সুষম ভারসাম্যের দিকে। পদার্থবিজ্ঞানে কিছু মৌলিক ধ্রুবক আছে যেমন মহাকর্ষ ধ্রুবক, আলোর বেগ, প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক। এগুলোর মান যদি সামান্যতম, এক ভাগ লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগ পরিবর্তন হতো, তাহলে এই মহাবিশ্বে জীবন সৃষ্টি হতো না। তারা তৈরি হতো না, গ্রহ তৈরি হতো না, রসায়ন কাজ করতো না।
এই নিখুঁততা কি শুধুই কাকতালীয়? বিজ্ঞানীরা একে ফাইন-টিউনিং সমস্যা বলেন। কেউ বলেন এটা মাল্টিভার্সের প্রমাণ, অসংখ্য মহাবিশ্বের মধ্যে আমরা সেই একটিতে আছি যেখানে জীবন সম্ভব। কিন্তু মাল্টিভার্স তত্ত্বও প্রমাণ করা সম্ভব নয়। আবার কেউ বলেন, এই নিখুঁততা কোনো পরিকল্পনার ইঙ্গিত, কোনো ডিজাইনারের উপস্থিতির ইঙ্গিত।
আসল কথা হলো, আমরা জানি না। আর না জানাটাই হয়তো সবচেয়ে সত্য উত্তর।
কিন্তু এই না জানার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবতার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা প্রশ্ন করি। আমরা খুঁজি।
প্রতিটি যুগে বিজ্ঞান রহস্যের পর্দা সরিয়েছে। তাহলে কেন আজকের রহস্যগুলো সরবে না? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি, চেতনা এগুলো হয়তো আগামী পঞ্চাশ বা একশ বছরে আমরা এগুলোর উত্তর পাব। কিন্তু আবার হয়তো পাব না।
আর সেটাই হয়তো মহাবিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর দিক। আমরা কখনোই সব জানবো না। সবসময় কিছু না কিছু থেকে যাবে অজানা। আর সেই অজানাই আমাদের টেনে নিয়ে যায় এগিয়ে। যদি আমরা সব জানতাম, তাহলে কী করতাম? বসে থাকতাম? না, আমরা মানুষ। আমরা অনুসন্ধান করি। এটাই আমাদের স্বভাব।
পদার্থবিজ্ঞান হয়তো আমাদের বলতে পারে কীভাবে মহাবিশ্ব কাজ করে, কিন্তু কেন কাজ করে, এই কেনর উত্তর বিজ্ঞানের সীমানার বাইরে হতে পারে। অথবা বিজ্ঞানের মধ্যেই আছে আমাদের অপেক্ষার জন্যই একদিন তার রহস্য উন্মোচন হবেই।
আইনস্টাইন বলেছিলেন, "The most beautiful thing we can experience is the mysterious. It is the source of all true art and science." রহস্যই আমাদের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা। এই রহস্যই জন্ম দেয় শিল্পের, জন্ম দেয় বিজ্ঞানের।
তাহলে কি মহাবিশ্বের এই পঁচানব্বই শতাংশ অন্ধকার কি কখনো আলোতে আসবে? ডার্ক ম্যাটারের রহস্য কি আমরা ভেদ করতে পারবো? ডার্ক এনার্জির উৎস কি খুঁজে পাব? চেতনার রহস্য কি উন্মোচিত হবে?
হয়তো হবে। হয়তো হবে না। কিন্তু একটা জিনিস নিশ্চিত, আমরা খোঁজা বন্ধ করবো না। কারণ খোঁজাটাই আমাদের মানুষ করে তোলে। না জানা মানেই হার নয়, না জানার স্বীকার করাই আসলে জ্ঞানের প্রথম পদক্ষেপ।
সক্রেটিস বলেছিলেন, "I know that I know nothing." আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না। আর এই না জানার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সব জানার সম্ভাবনা। মহাবিশ্ব হয়তো তার সব রহস্য কখনো প্রকাশ করবে না। কিন্তু প্রতিটি ছোট আবিষ্কার আমাদের এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রতিটি প্রশ্ন আমাদের করে তোলে আরও কৌতূহলী।
এবার বলুন, আপনি কি মনে করেন? বিজ্ঞান কি একদিন সব রহস্যের উত্তর দেবে, নাকি কিছু প্রশ্ন চিরকাল অনুত্তরিতই থেকে যাবে? আর সেটা কি খারাপ? নাকি সেই অনুত্তরিত প্রশ্নগুলোই আমাদের মানবিক করে রাখে?
এই বিশাল রহস্যময়, অজানা মহাবিশ্বে আপনি একা নন। আমরা সবাই একসাথে খুঁজছি। আর এই খোঁজাটাই হয়তো গন্তব্যের চেয়েও সুন্দর।
-Collected