15/06/2026
◾শ্রীরাম কি বাংলার বহিরাগত? নাকি ইতিহাস বিকৃত করে বাঙালি সনাতনীদের নিজেদের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে?
সম্প্রতি গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীরামের বিগ্রহকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পুরোনো অপপ্রচার আবারও ছড়ানো হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে“রামচন্দ্র বাংলার বহিরাগত”, “বাঙালি হিন্দুরা কখনো রামের আরাধনা করেনি”, “দুর্গাপূজা ও কালীপূজাই নাকি বাঙালি হিন্দুদের একমাত্র সংস্কৃতি” ইত্যাদি।
এ ধরনের দাবি শুধু ইতিহাসবিরোধী নয়, বরং বাঙালির হাজার বছরের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সম্পূর্ণ অস্বীকার।
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীরাম কোনো নির্দিষ্ট দেশ, অঞ্চল বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পত্তি নন; তিনি সমগ্র সনাতন সমাজের আরাধ্য। বাংলার সনাতনীরাও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভক্তিভরে তাঁর নাম স্মরণ ও পূজা করে আসছেন।
◾বঙ্গদেশ ও রামায়ণ সংস্কৃতির প্রাচীন সম্পর্ক
বঙ্গদেশ ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তভূমি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মায়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় রামায়ণের প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রবেশদ্বার ছিল বঙ্গের সমুদ্রবন্দরসমূহ।
খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ-৭ম শতাব্দীতে ভট্টিকাব্য বা ‘রাবণবধ’ বঙ্গদেশে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। তৃতীয় শতাব্দীতে ভাসের ‘প্রতিমা নাটক’ ও ‘অভিষেক নাটক’ রামচরিত্রকে কেন্দ্র করে রচিত হয়। সপ্তম শতাব্দীতে ভবভূতির ‘মহাবীর চরিত’ ও ‘উত্তর রামচরিত’ সমগ্র ভারতবর্ষের মতো বাংলাতেও বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
১৮৬২ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘উত্তর রামচরিত’-এর অংশবিশেষ বঙ্গানুবাদ করে ‘সীতার বনবাস’ নামে প্রকাশ করেন। পরে উমেশচন্দ্র মিত্র, কেদারনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, রাসবিহারী মুখোপাধ্যায় ও গিরিশচন্দ্র ঘোষ এই কাহিনি অবলম্বনে নাটক ও সাহিত্য রচনা করেন। বিশেষত গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘সীতার বনবাস’ বঙ্গ রঙ্গমঞ্চে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।
◾প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ কী বলে?
যদি রাম বাংলার বহিরাগত হতেন, তাহলে বাংলার মাটিতে এত প্রাচীন রাম-সম্পর্কিত নিদর্শন এল কোথা থেকে?
• বগুড়া থেকে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের রামায়ণের সচিত্র পোড়ামাটির ফলক আবিষ্কৃত হয়েছে, যা বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত।
• একাদশ শতকের বাদাল, ধামোরহাট ও নওগাঁ-রাজশাহীর দশাবতার ভাস্কর্যে রামচন্দ্রের প্রতিকৃতি পাওয়া যায়।
• দক্ষিণ দিনাজপুরের ধর্মপুরে দশম শতাব্দীর দশাবতার মূর্তিতে রামচন্দ্র চিত্রিত আছেন।
• দ্বাদশ শতাব্দীর ভানোর (রাজশাহী) দশাবতার ভাস্কর্যেও রামের উপস্থিতি রয়েছে।
• মুন্সিগঞ্জের সোনারংয়ে একাদশ শতাব্দীর ধনুর্ধর রামচন্দ্রের অসাধারণ ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে।
• গণেশপুর, মণ্ডা, নওগাঁ-রাজশাহী অঞ্চল থেকে ত্রয়োদশ শতকের রাম-লক্ষ্মণ-সীতা ভাস্কর্য পাওয়া গেছে।
যদি বাংলায় রামভক্তি না থাকত, তবে এইসব মূর্তি নির্মাণ করল কারা?
◾বাংলার সাহিত্যজুড়ে শ্রীরাম
নবম শতাব্দীতে নাট্যকার অভিনন্দ ‘রামচরিত’ রচনা করেন, যা বঙ্গদেশে রচিত প্রাচীনতম রামায়ণনির্ভর নাটক।
দশম-একাদশ শতকে সন্ধ্যাকর নন্দী তাঁর বিখ্যাত ‘রামচরিত’ কাব্যে পাল সম্রাট রামপালের ইতিহাসকে রামায়ণের আঙ্গিকে উপস্থাপন করেন। এটি প্রমাণ করে যে তখন রামকথা সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ছিল।
পঞ্চদশ শতকে কৃত্তিবাস ওঝা রচনা করেন ‘শ্রীরাম পাঁচালী’ বা কৃত্তিবাসী রামায়ণ, যা বাংলার ঘরে ঘরে পাঠ করা হতো। কৃত্তিবাসী রামায়ণে পাওয়া যায়—
“রামজয় শব্দ করে ধাইল বানর।
বানর দেখিয়া রোষে যত নিশাচর॥”
অর্থাৎ “রামজয়” বা “জয় শ্রীরাম” বাংলার সংস্কৃতিতে বহু শতাব্দী ধরেই বিদ্যমান।
◾রামনবমী কি বাংলায় নতুন?
একেবারেই নয়।
বাংলায় রামনবমী পালনের বিধান পাওয়া যায়—
• পুরোহিত দর্পণ (পৃষ্ঠা ৩২৬)
• পুরোহিত সর্বস্ব (পৃষ্ঠা ৩৩১)
• ক্রিয়াকাণ্ডবারিধি, ১ম খণ্ড (পৃষ্ঠা ৬৫৭)
এই গ্রন্থগুলো যথাক্রমে ১৩৪০, ১৩১৩ ও ১৩১৭ বঙ্গাব্দে রচিত। অর্থাৎ আজ যারা রামনবমীকে “নতুন” বলে দাবি করছেন, তাদের জন্মের বহু আগেই বাংলার পুরোহিত সমাজে রামনবমী সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় আচার ছিল।
◾“জয় শ্রীরাম” কি আধুনিক রাজনৈতিক স্লোগান?
জয় শ্রীরাম কোন রাজনৈতিক স্লোগান নয় এটি একটি ধর্মীয় স্লোগান জয় শ্রী রামের অর্থ শ্রীরাম চন্দ্রের জয় হোক রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডে (৪২.৩৩) পাওয়া যায়—
“জয়ত্যতিবলো রামো”
এছাড়া ১৮৭০ সালে অক্ষয়কুমার দত্তের ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ এবং ১৮৬১ সালে H.H. Wilson-এর ‘Religious Sects of Hindus’ গ্রন্থে রামানন্দী সম্প্রদায়ের অভিবাদন হিসেবে “জয় শ্রীরাম”-এর উল্লেখ রয়েছে।
◾শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ ও বাংলার রামভক্তি
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সহচর মুরারি গুপ্ত ছিলেন একনিষ্ঠ রামভক্ত। চৈতন্যচরিতে তাঁর রামভক্তির অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে।
মহাপ্রভু নিজেও যাত্রাপথে উচ্চারণ করতেন—
“রাম রাঘব রাম রাঘব রাম রাঘব রক্ষমাম্।
কৃষ্ণ কেশব কৃষ্ণ কেশব কৃষ্ণ কেশব পাহিমাম্॥”
অন্যদিকে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের গৃহদেবতা ছিলেন রঘুবীর (শ্রীরাম)। তাঁর স্বহস্তে লিখিত রামায়ণভিত্তিক পালাগান আজও সংরক্ষিত আছে।
◾বাংলার ঘরে ঘরে রামের উপস্থিতি
বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন, ভাষা ও সংস্কৃতিতেও রামের গভীর প্রভাব রয়েছে।
আজও আমরা বলি—
• “রাম রাম!”
• “ভূতের মুখে রামনাম”
• “সাতকাণ্ড রামায়ণ পড়ে সীতা কার বাপ”
• “যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ”
• “রামের ধনুর্ভঙ্গ”
এসব প্রবাদ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অংশ।
ইতিহাস, সাহিত্য, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্মীয় গ্রন্থ, লোকসংস্কৃতি এবং বাঙালির দৈনন্দিন ভাষা—সবকিছুই একবাক্যে সাক্ষ্য দেয় যে মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীরাম বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাংলার সনাতনীরা শুধু দুর্গাপূজা বা কালীপূজাই করেনি; তারা যুগে যুগে ভগবান শ্রীরাম, শ্রীকৃষ্ণ, শিব, মা কালীসহ সনাতন ধর্মের সকল আরাধ্য দেব-দেবীর পূজা ও স্মরণ করেছে।
তাই শ্রীরামকে বাংলার বহিরাগত বলা ইতিহাস, সাহিত্য ও বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নামান্তর।
শ্রীরাম ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—বাঙালি সনাতনীদের হৃদয়ে, সংস্কৃতিতে ও ঐতিহ্যে।
🚩 জয় শ্রীরাম।