06/05/2021
জাকাত ও রমযানের ফাযায়েল ও মাসায়েল
মাওলানা মুহাম্মদ ওমর (দা.বা.)
-------------------
যাকাত শব্দটি আরবি ‘তাযকিয়াতুন’ থেকে নির্গত। এর অর্থ পবিত্র করা। পবিত্রতা বৃদ্ধি হওয়া, উন্নতি লাভ করা ইত্যাদি অর্থেও যাকাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে যেহেতু মানুষের অন্তর পবিত্র হয়, কৃপণতা থেকে রক্ষা পায়, সম্পদে বরকত হয়, গুনাহ ও আযাব থেকে মুক্তি পায়, তাই এর নাম যাকাত রাখা হয়েছে। যাকাতের হুকুম মূলত হিজরতের পূর্বে নামাযের সাথে অবতীর্ণ হলেও, হিজরী দ্বিতীয় সনে রোযার বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে তা কার্যকরীভাবে ফরয হয়। (শরহে নুকায়া- ১/১৪৫)।
কুরআন মাজীদে যাকাতের বিধান
--------------------
যাকাত ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। পবিত্র কুরআনে যেখানেই নামাযের হুকুম এসেছে তার সাথে সাথে সেখানে যাকাতের হুকুমও এসেছে। যাকাতের শর্তসমূহ পাওয়া গেলে যেভাবে প্রত্যেকের উপর যাকাত আদায় করা ফরয, ঠিক তেমনিভাবে যাকাত যে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আহকাম তা বিশ^াস করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয। কেউ যদি যাকাতকে অস্বীকার করে তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। যাকাত ফরয হওয়ার পর কেউ যদি তা আদায় না করে, তাহলে সে ফাসেক। (আহকামে রমাযান ও যাকাত:৬৯)।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে নামায, রোযা, হজ ও অন্যান্য ফরয বিধানের সাথে যাকাতের আলোচনাও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে করেছেন। যাকাতের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে কুরআনের প্রায় ৩২ স্থানে নামাযের সাথে সাথে যাকাতের আলোচনা করেছেন। (ফাতাওয়া শামী- ১/২৫৬)।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা নিয়মানুবর্তীতার সাথে নামায আদায় করো এবং যাকাত দাও। অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তোমরা নামায আদায় করো এবং যাকাত দাও”। (সূরা বাকারা- ৪৩)।
হাদীসে যাকাতের বিধান
-----------------
যাকাতের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। (১) হযরত উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বিদায় হজের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করো। রমাযান মাসে রোযা রাখো এবং তোমাদের সম্পদের যাকাত আদায় করো। (বুখারি, কিতাবুল ঈমান) (২) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি জিনিসের উপর প্রতিষ্ঠিত ১. এ কথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত রাসূল ২. নামায আদায় করা ৩. যাকাত প্রদান করা ৪. বাইতুল্লাহ শরীফের হজ করা ৫. রমাযান মাসের রোযা রাখা। (বুখারী, হাদীস- ৮)।
যাকাতের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
---------------
মানুষ যখন তার জীবন-যাপনের প্রধান উপকরণ, জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন, এবং পরিশ্রম ও কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত অত্যধিক প্রিয় বস্তু ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় খরচ) যাকাত ইত্যাদিতে( করে, তখন কৃপণতার কদর্যতা অন্তর থেকে দূর হয়ে তাতে ঈমানের এক বিশেষ শক্তি ও দৃঢ়তা সৃষ্টি হয়। কেননা পরিশ্রমের উপার্জিত সম্পদ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান করা এমন একটি নেক আমল, যা মানুষের ভিতরে লুকায়িত নিকৃষ্ট নাপাকি তথা কৃপণতাকে দূর করে দেয়।
আবার এটি এমন একটি আমল, যা পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার সাথে বান্দার সুসম্পর্ক ও নৈকট্যতার বন্ধনকে গভীর করে তোলে। বলাবাহুল্য, মানুষের কষ্টে অর্জিত প্রিয় সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা নফসের জন্য অত্যন্ত কঠিন কাজ। এ ত্যাগের কারণে আল্লাহ তাআলার সাথে যাকাত আদায়কারীর সম্পর্ক বেশি হয়, ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি পায়। এ মহতি লক্ষ্যকে সামনে রেখে ধনী ব্যক্তিদের উপর যাকাত ফরয করা হয়েছে। এমটি না হলেও মানবতার দাবি হচ্ছে গরিবের সাহয্যে ধনীদের এগিয়ে আসা। সহানুভূতিশীলতা হচ্ছে মানুষের একটি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন গুণ। যাকাত ও সাদ্কা গুনাহ থেকে মুক্তির এবং সম্পদের র্বকত বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি উত্তম পন্থা। সমাজে বিভিন্ন রকম অসহায় দুর্বল ও অভাবগ্রস্ত লোক থাকে, নানা ধরনের দুর্ঘটনা ও বিপদ-আপদে এসব লোক জর্জরিত হতেই পারে। সুতরাং সাহায্য-সহানুভূতির মাধ্যমে বিপদ-আপদ দূর করার ব্যবস্থা যদি না থাকে, তাহলে অনাহার ও অর্ধাহার ইত্যাদিতে জন-জীবন ও সমাজ ব্যবস্থার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে যাবে। (আহকামে ইসলাম আকল কি নযর মে- ১০২)।
যাকাতের হুকুম
---------------
প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয় এবং তাতে এক বছর অতিবাহিত হয়, তার উপর যাকাত ফরয। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, কোনো সম্পদের যাকাত বছর অতিবাহিত হওয়া ছাড়া ওয়াজিব হবে না। (আবু দাউদ- ১৫৭৩)।
যাকাত অনাদায়ের শাস্তি ও কঠোরতা
------------------
হাদীস শরীফে যাকাতের ফযীলত, যাকাত প্রদানে উৎসাহ যেমন বর্ণিত হয়েছে, তেমনি যাকাত অনাদায়কারী ব্যক্তি সম্পর্কে কঠিন শাস্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা যে ব্যক্তিকে ধন-সম্পদ দান করেছেন, অথচ সে তার যাকাত আদায় করলো না, কিয়ামতের দিন এসব ধন-সম্পদকে তার জন্য বিষধর সাপের আকৃতিতে রূপান্তরিত করে দেয়া হবে। যে সাপের চোখের উপর দুটি কালো দাগ থাকবে। (অত্যন্ত বিষধর সাপের চিহ্ন এমন হয়ে থাকে)। সাপটি ঐ ব্যক্তির উভয় চোয়াল দংশন করে বলবে, আমি তোমার সম্পদ! আমি তোমারি সঞ্চিত সম্পদ!! (বুখারী শরীফ, হাদীস- ১৪০৩)।
হযরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, যে জাতি যাকাত প্রদান থেকে বিরত থাকে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত করে শাস্তি প্রদান করেন।
যাকাতের মাসায়েল
-----------
১. কারো কাছে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা কিংবা এর যে কোনো একটির সমমূল্যের মুদ্রা বা টাকা থাকলে তার উপর যাকাত ফরয। এ ক্ষেত্রে নগদ টাকা-পয়সা ইত্যাদি স্বর্ণ-রূপার বিধানের অন্তর্ভূক্ত হবে। (মাবসূত- ২/২৫৪, ফাতওয়া শামী- ৩/২০৮)।
২. মিল কারখানা ইত্যাদির যন্ত্রপাতির উপর যাকাত ফরয না হলেও তার থেকে উৎপাদিত পণ্যের উপর যাকাত ফরয। আসবাবপত্র তৈরির উদ্দেশ্যে কারখানায় রাখা কাঁচামালের উপরও যাকাত ওয়াজিব।
৩. স্বর্ণ কিংবা রূপার তৈরি যে কোনো জিনিস যেমন- গহনাপাতি, কাপড়ের পাড়, লেস, জরি ইত্যাদির উপর যাকাত ওয়াজিব। যদিও এ লেস, নকশা ও জরি কাপড়ের সাথে লেগে থাকে। (মাবসূত- ২/২৫৭)।
৪. কারো কাছে যদি অল্প পরিমাণে নগদ অর্থ, এবং স্বল্প পরিমাণের স্বর্ণ কিংবা রূপা এবং ব্যবসার কিছু সম্পদ আছে, যা পৃথকভাবে কোনটাই জাকাতের নেসাব পরিমাণ পৌঁছায় না, এ অবস্থায় সবগুলো একত্রিত করে যদি সর্বমোট মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার সমান হয়, তাহলে তার উপর যাকাত আদায় করা ফরয। এর থেকে কম হলে যাকাত আদায় করতে হবে না।
৫. প্রভিডেন্ট ফান্ডের অনুত্তলিত টাকার উপর যাকাত ফরয নয়। কিন্তু চাকরি শেষ হওয়ার পর এ ফান্ডের টাকা হস্তগত হলে এবং তা নিছাবের সমপরিমাণ হলে যাকাত ফরয হবে। আর এ অর্থ হাতে আসার পূর্বে বিগত বছর গুলোর যাকাত আদায় করা ফরয নয়। (কিফায়াতুল মুফতী- ৪/২৬০)।
৬. নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক বছর শেষ হওয়ার পূর্বে যাকাত আদায় করলে তা জায়েয হবে। (মাবসূত- ২/২৩৬, ফাতাওয়া আলমগীরী- ২/১৮৬)।
৭. একজন মিসকীনকে যাকাত ফরয হওয়া সমপরিমাণ সম্পদ দেয়া মাকরূহ। কেউ যদি এভাবে দিয়েও ফেলে তাহলে তার যাকাত আদায় হয়ে যাবে। (হিদায়া- ১/২০৮)।
৮. যাকাত আদায় হওয়ার জন্য শর্ত হলো, কোনো রকম পরিশ্রমের বিনিময় ছাড়া তার প্রকৃত হক্বদারকে যাকাত প্রদান করা।
৯. যাকাত আদায় হওয়ার জন্য অপর একটি শর্ত হলো, যাকাতের হকদারের পূর্ণ মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে সম্পদের মালিক বানিয়ে দেয়া। এমন না করলে যাকাত আদায় হবে না। (হিন্দিয়া- ১/২৩২)।
১০. হারাম পন্থায় উপার্জিত সম্পদের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়; বরং তা সম্পূর্ণরূপে সাদ্কা করা ওয়াজিব। ফাতওয়া শামীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হারাম সম্পদ নেসাব পরিমাণ হলে, তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না; বরং তা সম্পূর্ণভাবে সাদ্কা করে দিতে হবে। (ফাতওয়া শামী- ২/২৯১)। সেখানে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, যে ব্যক্তি কোনো ফকীরকে হারাম সম্পদ সাদ্কা করে সাওয়াবের আশা রাখবে, সে কাফির হয়ে যাবে।
১১. হালাল ও হারাম সংমিশ্রিত সম্পদের উপর যাকাত ফরয।
১২. মালে যিমারের উপর যাকাত ফরয নয় (শরীয়তের পরিভাষায়: যে সম্পদের উপর মালিকানা থাকা সত্ত্বেও তা থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়, তাকে মালে যেমার বলা হয়)। (দুররে মুখতার- ১/২৬৬)।
১৩. যাকাত ওয়াজিব হওয়ার সাথে সাথে তা আদায় করা যরুরী, দেরি করা অনুচিত। এতে বিলম্বকারী গোনাহগার হবে। কোনো ব্যক্তি যাকাত আদায়ে বিলম্ব করার কারণে সম্পদ নষ্ট কিংবা ধ্বংস হয়ে গেলে, ফরয ছেড়ে দেয়ার গোনাহ থেকে রেহাই পাবে না। (হাশিয়া মারাকী- ৩৮৮)।
১৪. যাকাত আদায়কারীর উসূল তথা মাতা পিতা, দাদা-দাদী ও নানা-নানী এবং ফুরু তথা ছেলে মেয়ে ও তাদের সন্তান-সন্তুতি ছাড়া অবশিষ্ট সকল আত্মীয় স্বজন যেমন, আপন ভাই-বোন, চাচা, ভাতিজা, খালা ও মামাকে দেয়া জায়েয। (আল-ইখতিয়ার- ১/১৯৫, কিফায়াতুল মুফতী- ৪/২৬২)।
ইমাম সুন্দুসী (র.) বলেন, যাকাত সাদ্কা ও ফিতরা সাত শ্রেণির লোক থেকে কোনো এক প্রকারকে দেয়া উত্তম। তারা হল, ১. আপন গরিব ভাই, ২. দরিদ্র বোন, ৩. দরিদ্র ভাতিজা, ৪. দরিদ্র ভাতিজি, ৫. দরিদ্র খালা, ৬. দরিদ্র চাচা, এবং দরিদ্র মামা। এরপর যাকাতের অধিক উপযুক্ত হচ্ছে যথাক্রমে নিজ প্রতিবেশী, এলাকাবাসী এবং শহরবাসী।
১৫. যাকাত এবং সাদ্কা আলেম ও তালিবে ইলম তথা যারা ইসলাম এবং মুসলিম উম্মাহর খেদমতের উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করছে তাদেরকে দান করা সবচেয়ে উত্তম।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (র.) নিজের মালের যাকাত সর্বদা আলেম সমাজের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। তিনি বলতেন আমি নবুওয়াতের সম্মানের পরে আলেমগণ থেকে বেশি সম্মানিত আর কাউকে দেখি না। আলেম সম্প্রদায় অর্থ-বিত্তহীন হয়ে গেলে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের কাজ থেমে যাবে। এতে দ্বীনী কাজে শিথিলতা দেখা দিবে। (এহায়াউ উলুমিদদীন, যাকাত অধ্যায়)।
এছাড়া দুররে মুখতার ফাতওয়া শামী ও ফাতওয়া আলমগীরীতে বলা হয়েছে যে, যাকাত ও সাদ্কা মুর্খ ফকীর থেকে দরিদ্র আলেমকে দেয়া উত্তম। (ফাতাওয়া রহিমমিয়াহ- ৭/১৬৯)।
১৬. কেউ ঋণ দিলে এবং গ্রহীতা তা স্বীকার করে আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিলে অথবা ঋণ প্রদানকারীর নিকট বিদ্যমান প্রমাণাদি দিয়ে আদালতে শ^^রণাপন্ন হয়ে তা আদায় করা সম্ভব হলে এমন সম্পত্তির উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। অন্যথায় ঋণের টাকা হস্তগত না হওয়া পর্যন্ত যাকাত ওয়াজিব হবে না। এ ধরনের ঋণের টাকা হস্তগত হওয়ার পর বিগত বছরগুলো হিসেব করে সম্পূর্ণ যাকাত আদায় করতে হবে।
রমাযানে রোযার করণীয় ও বর্জনীয়
-----------------------
রমাযানের রোযা হলো ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। একে অস্বীকারকারী কাফের, এবং প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমান যদি ইচ্ছাকৃত ফরয রোযা ছেড়ে দেয় তাহলে গোনাহগার ও ফাসেক বলে গণ্য হবে।
রোযার নিয়ত: নিয়ত বলা হয় অন্তরের ইচ্ছা ও আগ্রহকে। এটি মনে মনে হোক বা মুখে উচ্চারণে হোক, থাকতে হবে। রোযার জন্য নিয়ত শর্ত। সুতরাং কেউ রোযার নিয়ত ছাড়া সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকলেও তা রোযা বলে গন্য হবে না। রমাযানের রোযার নিয়ত রাতে করা উত্তম। রাতে নিয়ত করতে না পারলে শরয়ী দিনের অর্ধেক অংশ (সুবাহে সাদিক থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে দুই ভাগ করলে প্রথম ভাগ শরয়ী দিনের প্রথম অংশ) পর্যন্ত নিয়ত করতে পারবে।
যে সকল কারণে রোযা ভঙ্গ হয়
-------------------
১. নাকে ও কানে ঔষধ প্রবেশ করালে। ২. ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভর্তি বমি করলে। ৩. কুলি করার সময় গলার ভেতর পানি চলে গেলে। ৪. খাদ্য ও খাদ্য হিসেবে গন্য নয় এমন বস্তু গিলে ফেললে। ৫. আগরবাতি বা এ জাতীয় বস্তুর ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে নাকে বা গলায় প্রবেশ করালে। ৬. বিড়ি, সিগারেট পান করলে। ৭. ভুলে কিছু খাওয়ার পর রোযা ভেঙে গেছে মনে করে ইচ্ছাকৃতভাবে পুনরায় খেলে। ৮. রাত বাকি আছে মনে করে সুবহে সাদেকের পর সেহরী খেলে। ৯. দিন বাকি থাকতে সূর্য ডুবে গেছে মনে করে ইফতার করলে। উপরে বর্ণিত কাজগুলোর কারণে রোযা ভঙ্গ হয়ে গেলে শুধু কাযা ওয়াজিব হবে, কাফফারা নয়। ১০. ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী সহবাস কিংবা পানহার করলে কাযা ও কাফফারা উভয়টি ওয়াজিব।
কাফ কী?
-------------
কাফ্ফারা হলো একটি গোলাম আযাদ করা অথবা ৬০টি রোযা ধারাবাহিকভাবে এক সাথে রাখা। এ ধারাবাহিকতায় একটি রোযা ভেঙে গেলে পুনরায় নতুনভাবে ৬০টি রোযা রাখতে হবে। রোযা রাখার শক্তি না থাকলে ষাট জন মিসকীনকে দুইবেলা পেট ভরে খাওয়াতে হবে। বর্তমানে গোলাম-বাদীর প্রচলন না থাকায় রোযা রাখা বা মিসকীন খাওয়ানোর যে কোনো একটি নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
রোযা মাকরূহ হওয়ার কারণসমূহ
-------------------
১. কোনো জিনিস চিবানো বা স্বাদ গ্রহণ করে ফেলে দেয়া। টুথপেস্ট, মাজন ও কয়লা ইত্যাদি দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা তবে এসবের স্বাদ গলায় প্রবেশ করলে রোযা ভেঙে যাবে। (ফাতাওয়ায়ে শামী- ৩/৩৯৫)।
২. গোসল ফরয হওয়ার পর সারা দিন এ অবস্থায় থাকা।
৩. শিঁঙ্গা লাগানো অথবা কোনো রোগীকে রক্ত দান করা। ৪. রোযার দিনে গীবত বা পরনিন্দা চর্চা করা অত্যন্ত গোনাহের কাজ।
৫. ঝগড়া বা কোনো কারণে মানুষ কিংবা প্রাণী বা কোনো জড়পদার্থকে গালি দেয়া।
৬. রোযাদার নারীর জন্যে ঠোঁটে রঙিন জিনিস লাগানো জায়েয হলেও মুখের ভেতর প্রবেশের আশঙ্কা থাকলে তা মাকরূহ। (আহসানুল ফাতওয়া- ৪/৪২৪)।
৭. শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল এবং রোযা রাখার শক্তি হারানোর প্রবল আশঙ্কা অবস্থায় ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্ত বের করা (আহসানুল ফাতওয়া- ৪/৪২৭)।
৮. প্রয়োজন ছাড়া দাঁত উঠানো বা দাঁতে ঔষধ ব্যবহার করা।
রোযা ভঙ্গ বা মাকরূহ না হওয়ার কারণসমূহ
-----------
১. মিসওয়াক করা। ২. মাথায় বা মোচে তেল দেয়া। ৩. চোখে ঔষধ বা সুরমা ব্যবহার করা। ৪. গরম বা পিপাসার কারণে গোসল করা। ৫ খুশবু ব্যবহার বা তার ঘ্রাণ গ্রহণ করা। ৬. ইনজেকশন বা টিকা দেয়া। ৭. ভুলে পানাহার করা অথবা অনিচ্ছায় গলায় ধুলা-বালি বা মাটি ঢুকে যাওয়া। ৮. এমনিতে বমি হওয়া। ৯. দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত বের হওয়া। তবে তা যদি পেটে প্রবেশ করে এবং স্বাদ অনুভব হয়, তাহলে রোযা ভেঙে যাবে।
যে সব কারণে রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে
----------------
১. কোনো অসুখের কারণে রোযা রাখার শক্তি হারিয়ে ফেললে অথবা রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা হলে। তবে পরে সুস্থ হলে এ রোযার কাযা করতে হবে। ২. গর্ভবতী নারীর সন্তান কিংবা নিজের প্রাণনাশের ভয় হলে। ৩. অপরের সন্তানকে দুধ পান করানোর কারণে, ধাত্রী নারী নিজের কিংবা সন্তানের কষ্ট হলে। ৪. কোনো ব্যক্তি শরয়ী মুসাফির তথা নিজ বাড়ি থেকে শরয়ী ৪৮ মাইল দুরে সফর করার ইচ্ছা করে বের হলে। ৫. সফর অবস্থায় কষ্ট না হলে রোযা রাখা উত্তম, আর কষ্ট হলে না রাখাই উত্তম। ৬. রোযা রাখা অবস্থায় সফর শুরু করলে তা পূর্ণ করা জরুরি । আর সফর অবস্থায় রোযা না রেখে বাড়িতে ফিরে আসার পর দিনের কিছু অংশ বাকি থাকলে, পানহার থেকে বিরত থাকবে। কোনো ব্যক্তি পানহার না করা অবস্থায় দিনের প্রথম অংশ বাকি থাকা অবস্থায় নিজ বড়িতে ফিরে এলে নিয়ত করে রোযা রাখতে হবে। ৭. কেউ হত্যার হুমকি দিয়ে রোযা ভাঙ্গতে বাধ্য করলে, রোযা ভেঙে ফেলবে এবং পরে তার কাযা করতে হবে। ৮. কোনো রোগীর ক্ষুধা বা তৃষ্ণা এমন পর্যায়ে বৃদ্ধি পায় যে, কোনো মুসলমান দ্বীনদার ডাক্তার রোযা ভঙ্গ না করলে রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এ অবস্থায় রোযা ভেঙ্গে ফেলা ওয়াজিব। তবে পরে কাযা করে নিতে হবে। ৯. হায়েয বা নিফাস অবস্থায় রোযা রাখা জায়েযে নয়; বরং তা অন্য সময় কাযা করবে। উল্লেখ্য যাদের রোযা ভঙ্গের অনুমতি দেয়া হয়েছে তাদের জন্যে জনসম্মুখে পানাহার না করাই বাঞ্ছনীয়।
তারাবির মাসায়েল
---------------
ক. পবিত্র রমাযান মাসে ইশার নামায আদায়ের পর বিশ রাকআত তারবির নামায সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।
খ. তারাবির জামাত সুন্নাতে কিফায়া। মহল্লার মসজিদের জামাত অনুষ্ঠিত হওয়া অবস্থায় কেউ নিজ বাড়িতে পৃথকভাবে তারাবিহ পড়ে ফেললে তার সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু সে জামাতের সাওয়াব পাবে না। আর মহল্লার কোথাও তারাবির জামাত অনুষ্ঠিত না হলে, সকলেই সুন্নাত পরিত্যাগকারী হিসেবে গোনাহগার হবে।
গ. তারাবির নামাযে পূর্ণ কুরআন শরীফ খতম করা সুন্নাত। কুরআনের হাফেয পাওয়া না গেলে, কিংবা কুরআন খতম শোনানোর পারিশ্রমিক চাইলে, সূরা তারাবিহ আদায় করে নিবে। কেননা, কুরআন খতম শুনিয়ে পারিশ্রমিক দেয়া-নেয়া উভয়টি হারাম।
ঘ. কোনো হাফেয সাহেব কোনো মসজিদে বিশ রাকআত তারাবিহ পড়ে থাকলে একই রাতে তার জন্যে অন্য মসজিদের তারাবিহ পড়া জায়েয নেই।
ঙ. কোনো ব্যক্তির দু’চার রাকআত তারাবিহ বাকি রয়ে গেলে, আর এ অবস্থায় ইমাম বিতিরের জামাতের জন্যে দাড়িয়ে গেলে সে বিতিরের নামাযে শামিল হয়ে যাবে। পরে অবশিষ্ট তারাবির নামায আদায় করে নিবে।
চ. নামাযে কুরআন শরীফের হরফ ছুটে যায় এমন দ্রুত পাঠ করা গোনাহের কাজ। এতে ইমাম ও মুক্তাদি কেউ সওয়াব পাবে না।
ছ. জুমহুর উলামায়ে কেরামের ফাত্ওয়া মতে কোনো না বালেগ ছেলেকে তারাবির ইমাম বানানো বৈধ নয়। (জাওয়াহিরুল ফিকাহ- ১/৩৮২)।
সেহরীর প্রয়োজনীয় মাসায়েল
---------------
রোযাদার ব্যক্তির জন্য রাতের শেষ ভাগে সুবহে সাদেকের পূর্বে সেহরী খাওয়া বিশেষ বরকত ও সুন্নাত। রাতের প্রথম অর্ধেক চলে যাওয়ার পর পরই যে কোনো সময় পানাহার করলে তাতে সেহরী খাওয়ার সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। তবে রাতের শেষ ভাগে তা খাওয়া উত্তম। সময় হওয়ার পূর্বে আযান দিয়ে ফেললে সুবহে সাদেক হওয়া পর্যন্ত সেহরী খেতে কোনো অসুবিধা নেই।
মাসআলা: রোযার নিয়ত মনে মনে করা যথেষ্ট। তবে মুখে এ বাক্যটি বলা উত্তম “বিসাওমি গাদান নাওয়াইতু মিন শাহরি রমাযান” (জাওয়াহিরুল ফিকাহ- ১/৩৮১)।
ইফতার
-------
সূর্য ডুবে যাওয়ার পূর্ণ বিশ্বাস হলে ইফতারে দেরি করা মাকরূহ। আকাশে মেঘ থাকার কারণে সময়ের ব্যাপারে সন্দিহান হলে কিছু সময় দেরী করা ভালো। এক্ষেত্রে সূর্য অস্ত যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় থেকে সতর্কতা হিসেবে তিন মিনিট দেরি করা উত্তম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের কেউ যখন ইফতার করবে সে যেনো খেজুর দ্বারা ইফতার করে। কেননা এটি খুব বরকতময়।(তিরমিযি: ৬৭৮)।
খেজুর দিয়ে ইফতার স্বতন্ত্র একটি সুন্নাত। খেজুর ছাড়া অন্য কোনো হালাল খাবার দিয়েও ইফতার করা যায়।
ইফতারের দোয়া, “যাহাবায যামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরুক ওছাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ” (আবু-দাউদ)।
“আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়াআলা রিযকিকা আফতারতু”।
ইতিকাফ কী?
-------------
ইতিকাফের শাব্দিক অর্থ হল, অবস্থান করা। শরয়ী পরিভাষায়: ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করাকে (মসজিদে সম্পাদন করা সম্ভব নয় যেমন প্র¯্রাব-পায়খানা ও ফরয গোসল ইত্যাদি ছাড়া অন্য কোনো কাজের জন্যে মসজিদ থেকে বের না হওয়াকে) ইতিকাফ বলা হয়। (আল-ইখতিয়ার- ১/২১৮)
ইতিকাফের প্রয়োজনীয় মাসায়েল
-----------------------------
মাসআলা: রমাযানের শেষ দশ দিনে প্রত্যেক মহল্লার মসজিদে ইতিকাফ করা মহল্লাবাসীর উপর সুন্নাতে মুআক্কাদা কিফায়া। যাদি মহল্লাবসীর কেউ এই সুন্নাত আদায় না করে, তাহলে সুন্নাত ত্যাগ করার কারণে, সবাই গুনাহগার হবে।
মাসআলা: মহিলাগণ ঘরে নামাযের জন্য নির্ধারিত জায়গায় ইতিকাফ করবে। নির্ধারিত জায়গা না থাকলে সাময়িকভাবে একটি জায়গা নির্ধারণ করে নিবে। (হিন্দিয়া- ১/২৭৫)।
মাসআলা: ইতিকাফে অবস্থানকারীর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ইবাদত নেই। ইতিকাফ অবস্থায় চুপচাপ থাকা মাকরূহ। গল্প-গুজব করা আরো বেশি মাকরূহ। ইতিকাফে সম্পূর্ণ নিরব না থেকে নিজ ইচ্ছা এবং সামর্থ অনুযায়ী নামায, তিলাওয়াত, যিকির এবং দ্বীনি কিতাবাদি ইত্যাদি পাঠ করবে। (মালাবুদ্দা- ৯৯)।
মাসআলা: মুতাকিফ ব্যক্তি মসজিদ থেকে বাইরে বের হতে পারবে না। তবে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে (পেশাবÑপায়খানার জন্য) বের হতে পারবে। প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করার জন্য বাইরে গিয়ে বাথরুম খালি না পেলে বাইরে অপেক্ষা করতে পারবে। (হিন্দিয়া- ১/২৭২, আহসানুল ফাতওয়া- ৪/৫০১)।
অনুরূপভাবে জুমার নামাযের জন্যও বের হতে পারবে। তবে জুমার জন্য এতটুকু সময় নিয়ে বের হবে, যাতে করে জামে মসজিদে গিয়ে সুন্নাত এবং ফরয নামায আদায় করতে পারে। এর চেয়ে বেশি সময় সেখানে অপেক্ষা করবে না। (হিন্দিয়া- ১/১৭২)।
মাসআলা: মুতাকিফ ব্যক্তি কোনো অপারগতা ছাড়া সামান্য সময়ের জন্যও মসজিদের বাইরে যেতে পারবে না। গেলে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। (হিন্দিয়া- ১/২৭২)।
মাসআলা: মুতাকিফ ব্যক্তির জন্য জুমার দিনের গোসল, প্রশান্তি লাভের গোসল, জানাযার নামায, রোগী দেখা, পানাহার ও ঘুমানো ইত্যাদির উদ্দেশ্যে মসজিদ থেকে বের হতে পারবে না। এতে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। (জাওয়াহিরুল ফিকহ- ১/৩৮৩)।
মাসআলা: মুতাকিফ ব্যক্তির জন্য মসিজদে খাওয়া-দাওয়া করা এবং ঘুমানো জায়েয। মুতাকিফ ব্যতিত অন্য কারো জন্য মসজিদে এসব করা জায়েয় নয়। (হিন্দিয়া- ১/২৭৫)।
মাসআলা: রমাযানের শেষ দশদিনের ইতিকাফ করতে চাইলে বিশ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্বে মসজিদে প্রবেশ করতে হবে। আর ঈদের চাঁদ দেখার পর মসজিদ থেকে বের হবে।
মাসআলা: মুতাকিফ ব্যক্তি ভুলে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলে ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে তার উপর এক দিনের ইতিকাফ কাযা করা জরুরী। (হিন্দিয়া- ১/২৭৫)।
মাসআলা: কোনো ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট অথবা অনির্দিষ্ট সময়ের ইতিকাফের মান্নত করে, সে মান্নতের কোনো এক সময় ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে গেলে নতুনভাবে পূর্ণ ইতিকাফ কাযা করা ওয়াজিব। কেননা, মান্নতের মধ্যে ধারাবাহিকতা আবশ্যক। (হিন্দিয়া- ১/২৭৪)
মাসআলা: রমযানের শেষে দশকের সুন্নাত ইতিকাফের কোনো একদিনের ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে গেলে, শুধু ঐ দিনেরই ইতিকাফ কাযা করা ওয়াজিব। এই একদিনের কাযা রমাযানের হোক বা রমাযানের বাইরে, নফল রোযার সাথে আদায় করতে হবে। তবে পূর্ণ দশদিনের ই’তিকাফ কাযা করা উত্তম। (দুররে মুখতার- ২/৪৪, আহসানুল ফাতাওয়া- ৪/৫০১, ফাতাওয়া রহিমিয়া- ৫/২০৬)।
মাসআলা: মুতাকিফ ব্যক্তির জন্য মসজিদের এক কোনে কক্ষ তৈরি করে নেওয়া মুস্তাহাব। এতে নিজের সতর হিফাযত ছাড়াও অনেক সুবিধা রয়েছে। কেননা হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য চাটাইয়ের কক্ষ তৈরি করার প্রমাণ পাওয়া যায়, সুতরাং এটি বিদআত নয়। তবে মুতাকিফের জন্যে লক্ষণীয় হলো, সে অতিরিক্ত জায়গা ব্যবহার করে মুসল্লিদের অসুবিধা এবং কাতার সোজা করতে যেন ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে।
মাসআলা: মসজিদে ইতিকাফের নিয়ত ব্যতীত সেহরী অথবা ইফতার করা মাকরূহ। যদি কখনও মসজিদে ইফতার ইত্যাদির প্রয়োজন হয়, তাহলে নফল ইতিকাফের নিয়ত করে নিবে। (ফাতাওয়া আলগীরী- ৫/৫২৫, ফাতওয়া রহিমিয়া- ৫/২০৫)।
মাসআলা: ইফতার করার সময় মসজিদের ভেতর শোরগোল ও চেঁচামেচি করা এবং মসজিদের বিছানাপত্র নষ্ট করার মাধ্যমে মসজিদের আদাব নষ্ট হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। (শরহে মুনিয়া- ৫৬৭)।
পবিত্র লাইলাতুল কদর
-----------------
উম্মতের মুহাম্মাদীর হায়াতের পরিমান পূর্ববর্তী উম্মতগণ থেকে কম। তাই আল্লাহ তাআলা আখেরী যমানার উম্মতকে এমন একটি রাত দান করেছেন, যে রাতের ইবাদত এক হাজার মাস থেকে উত্তম। কিন্তু এ রাতকে সুনির্দিষ্ট না করে গোপন রাখা হয়েছে। যেনো লোকজন এর অনুসন্ধান করে ইবাদতের মাধ্যমে এ রাতের মহিমা ও অগনিত পুণ্য অর্জন করতে পারে। রমযান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে যেমন- ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ তারিখে শবে কদর হওয়ার বেশি সম্ভবনা রয়েছে। তাই এ রাতগুলোতে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে ইবাদত, তাওবা, ইস্তিগফার ও দুআ ইত্যাদিতে অত্যাধিক নিমগ্ন থাকাই বাঞ্ছনীয়। সারারাত জেগে থাকার শক্তি ও সুযোগ না হলো কমপক্ষে ইশা ও ফজরের নামায জামাতের সাথে আদায় করবে। এতে সারা রাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করার ছাওয়াব পাওয়া যাবে।
কদরের রাতে দুআ
----------------
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সত্যিই যদি শবে কদরকে পেয়ে যাই, তাহলে সে রাতে কোন দুআ পড়বো? জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়অ ফা’ফু আন্নী” দোয়াটি পড়বে। (আহমদ, ইবনে মাযাহ, তিরমিযী, মাযহারী- ১০/৩১৬)।
কদরের সম্ভাবনাময় রাতগুলোকে শুধু ওয়াজ-নসীহত করার মাধ্যমে অতিবাহিত করা নিতান্ত দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। তবে যারা সারারাত ইবাদতের জন্যে জাগ্রত থাকার সাহস করে, তারা অল্প সময় ওয়াজ নসীহত শুনে পরে নফল নামায ও দোয়ায় মনোনিবেশ করা মন্দ নয়। (জাওয়াহিরুল ফিকাহ- ১/৩৮৪)।
অসিয়ত পালনে যেসব বিষয়ে লক্ষ্য রাখা জরুরি
------------------
ক. প্রতি দিনের জন্য বিতিরসহ ছয় ওয়াক্ত নামাযের ফিদিয়া আদায় করতে হবে। এক ওয়াক্ত নামাযের ফিদিয়া পৌনে দুই সের গম অথবা তার মূল্য। সুতরাং এক দিনের নামাযের ফিদিয়া হচ্ছে, সাড়ে দশ সের গম অথবা তার মূল্য।
খ. প্রতিটি রোযার ফিদিয়া পৌনে দুই সের গম অথবা তার মূল্য দিতে হবে। আবার নযর ও মান্নতের রোযার ফিদিয়াও একই পরিমাণ দিতে হবে।
গ. যেসব বৎসরের যে পরিমাণ সম্পদের যাকাত বাকি রয়ে গেছে, তা যথাযথভাবে হিসেব করে আদায় করতে হবে।
ঘ.ফরয হজ আদায় না করে থাকলে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে বদলী হজ করাতে হবে। আর এর বিষয়ক খরচ ওয়ারিশদের বহন করতে হবে।
ঙ. অসিয়তকারী ঋণগ্রস্ত থাকলে ঋণদাতার প্রাপ্য অনুসারে তা পরিশোধ করতে হবে।
চ. ফিতরা বাকি থাকলে প্রত্যেকটির পরিবর্তে পৌনে দুই সের গম অথবা তার মূল্য আদায় করতে হবে।
ছ. কুরবানী না করে থাকলে ঐ বৎসর ছাগল অথবা গরুর এক সপ্তমাংশের মূল্য পরিমাণ সদকা করে দিতে হবে।
জ. তিলাওয়াতে সিজদা আদায় না করে থাকলে, সাবধানতা হিসেবে প্রত্যেক সিজদার পরিবর্তে পৌনে দুই সের গম অথবা তার মূল্য সদকা করতে হবে।
ঝ. কাযা নামায ও রোযার সঠিক হিসাব জানা না থাকলে অনুমান করে তা আদায় করতে হবে।
ঞ.কাফফারা আদায়ের জন্য প্রতিজন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়ানো জরুরি। শুধু এক বেলা খাওয়ালে কাফফারা আদায় হবে না। এক বেলা খাওয়ানো হয়েছে এমন মিসকীনকে আবার দ্বিতীয় বেলা খাওয়ানো ওয়াজিব। চাই একই দিনে হোক বা ভিন্ন দিনে। (আহসানুল ফাতওয়া- ৪/৪৪০)।
উক্ত নিয়মাবলী মৃত ব্যক্তির অসিয়ত করে সে পরিমাণ সম্পদ রেখে মারা গেলে কার্যকর হবে। নতুবা অংশীদারগণের উপর তা আদায় করা জরুরি নয়। তবে স্বেচ্ছায় তারা সহানুভূতি করলে যথেষ্ট সাওয়াব রয়েছে। (জাওয়াহিরুল ফিকাহ- ৩৯২-৯৩)।
সাদ্কাতুল ফিত্রঃ কী ও কেন?
------------------
সাদ্কাতুল ফিতর হলো, আল্লাহ তাআলা নিজ বান্দার উপর একটি সাদ্কা নির্ধারণ করেছেন, যা রমাযান মাস শেষে রোযা শেষ হওয়ার খুশি ও শুকরিয়া হিসেবে আদায় করতে হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযাকে ভুল ত্রুটি থেকে পাক-পবিত্র, দরিদ্র ও নিঃস্বদের পানাহারের ব্যবস্থার উদ্দেশ্যে সাদ্কাতুল ফিতরকে ফরয করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের আগেই সাদ্কাতুল ফিতর আদায় করবে, তার ফিতরা মকবুল হিসেবে গণ্য হবে। আর যে ঈদের নামাযের পরে আদায় করবে, তার ফিতরা সাধারণ সাদ্কা হিসেবে গণ্য হবে। (জামউল ফাওয়ায়েদ- ১/১৪৫)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ঐ দিন ভিক্ষা চাওয়া থেকে ভিক্ষুকদের মুক্ত করে দাও। (নাসবুর রায়াহ- ২/৪৩২)।
মাসআলা: সাদ্কাতুল ফিত্র ওয়াজিব হওয়ার সাথে সাথে আদায় করা উত্তম। বিলম্ব না করা উচিত। (আল-বাহরুর রায়েক২/২৫১)।
মাসআলা: ঈদের দিনের পূর্বে সাদ্কাতুল ফিত্র আদায় করা বৈধ। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যামানায় সাহাবীগণ ঈদের দিনের আগেই সাদ্কাতুল ফিত্র আদায় করে দিতেন। (মিনহাতুল খালেক- ২/২৫১)।
মাসআলা: ঈদুল ফিতরের দিন জীবনের প্রয়োজনীয় বস্তুগুলো ছাড়া যদি কোনো ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তাহলে তার উপর সদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব।
মাসআলা: কোনো কারণে কেউ রোযা রাখতে না পারলেও তার উপর সাদ্কাতুল ফিত্র ওয়াজিব।
মাসআলা: কোনো শিশু সন্তান ঈদের দিন সুবহে সাদিকের পূর্বে জন্মগ্রহণ করলে, তার পক্ষ থেকে সাদ্কাতুল ফিত্র আদায় করা ওয়াজিব। আর সুবহে সাদিকের পরে জন্ম নিলে তার ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য নয়। (ফাতওয়া আলমগীরী- ১/১৯২)।
সাদ্কাতুল ফিতরে পরিমাণ
-------------
মাসআলা: সাদ্কাতুল ফিত্রের পরিমাণ হলো- আটা, গম বা গমের ছাতু হলে আধা সা’। (নূরুল ইযাহ-৩৯৫)। আটা, গম বা গমের ছাতু এক সের সাড়ে বার ছটাক দিতে হবে তথা আধুনিক ওজন মাপে ১ কেজি ছয়শত তেত্রিশ গ্রাম (১.৬৩৩) বা তার সমপরিমাণ মূল্য দিতে হবে। তবে আদায়ের ক্ষেত্রে দুই সের অথবা নির্ধারিত পরিমানের চেয়ে কিছু বেশী দেয়া ভাল। খেজুর, যব অথবা কিসমিস দিলেও গম ইত্যাদির দিগুণ তথা সাড়ে তিন সের দিতে হবে। বর্তমান আধুনিক ওজনে যা তিন কেজি দুইশত ছিষট্টি গ্রাম (৩.২৬৬) বা তার সমপরিমাণ মূল্যের হয়। (বেহেশতী যেওর- ২/২৩০)।
মাসআলা: কেউ এসব জিনিস ছাড়া অন্য কিছু যেমন চাউল ইত্যাদি দিতে চাইলে, হিসেব করে খেজুর, গম, যব, কিসমিস ইত্যাদির সমপরিমাণ মূল্য আদায় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনুমান করে তার সমপরিমাণ চাউল দিলে জায়েয হবে না।
মাসআলা: সাদকাতুল ফিতর আদায়ের ক্ষেত্রে হাদীসে যে সব জিনিস দেয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে তা দিয়ে আদায় করবে। তবে বর্তমান সময়ে গরিব-দুখির প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য করে এসবের মূল্য আদায় করে দেয়া উত্তম। আর যে সকল জিনিস দেয়ার কথা উল্লেখ নাই, এসব জিনিসের মাধ্যমে আদায় করার ক্ষেত্রে তার মূল্য দেয়াই উত্তম। (ফাতওয়া আলমগীরী- ১/১৯২)।
মাসআলা: রমাযান মাসের শেষ তারিখ জন্মগ্রহণকারী নবজাতকের পক্ষ থেকে সাদ্কাতুল ফিত্র আদায় করা আবশ্যক। (কিফায়তুল মুফতী- ৪/২৯৪)।
মাসআলা: একজন মানুষের ফিত্রা একজন অথবা একাধিক ফকীরকে দিতে পারবে। (হাশিয়ায়ে তাহতাবী আলা মারাকী- ৫৯৬)।
ঈদের নামায আদায়ের পদ্ধতি
----------------
মাসআলা: প্রথমে মুখে অথবা মনে মনে নিয়ত করবে যে, আমি অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের সাথে ইমামের পেছনে ঈদের দুই রাকআত নামায আদায় করছি। এরপর আল্লাহু আকবার বলে ইমাম সাহেবের সাথে হাত বেঁধে সানা পড়বে। অতঃপর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তাকবীর বলার সময় কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে ছেড়ে দিবে। আর চতুর্থ তাকবীরের পর হাত বেঁধে নিবে। এর পর অন্যান্য নামাযের মত এ রাকাতের বাকি অংশটুকু আদায় করবে। দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতেহা ও অন্য সূরা মিলানোর পর ইমামের সাথে যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তাকবীরে কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে ছেড়ে দিবে। চতুর্থ তাকবীরের পর রুকুতে যাবে। অবশিষ্ট নামায স্বাভাবিক নিয়মে আদায় করবে। নামাযের পর খুতবা শুনবে। খুতবা শোনা ওয়াজিব।
উল্লেখ্য, পবিত্র মক্কায় আমাদের দেশ থেকে এক/দুই দিন পূর্বে চাঁদ উদিত হয়। সুতরাং কেউ যদি এদেশে রমাযান মাসের ২৯ তারিখে আসে, আর এই দিন সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে আগন্তুককে অন্য সবার সাথে রোযা রেখে ৩১তম রোযা পূরণ করতে হবে। এভাবে কোনো ব্যক্তি এদেশ থেকে মক্কা শরীফে চলে গেলে তার ২৮টি রোযা পূর্ণ হবে। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী এ সময় তাকে মক্কার লোকদের সাথে ঈদের নামায আদায় করতে হবে। এরপর তাকে একটি রোযা কাযা করে নিতে হবে। (ফাতাওয়া শামী- ২/৩৮৪, আহসানুল ফাত্ওয়া- ৪/৪২৩)।