06/07/2023
চাকরি বনাম উচ্চশিক্ষা: বাস্তবতা এবং স্বপ্ন
বনাম শব্দটা খেলাধুলায় বেশ ব্যবহার করা হয়। যেমন: আবাহনী বনাম মোহামেডান। টাইটেলে "বনাম" শব্দটা ব্যবহার করা হলেও চাকরি এবং উচ্চশিক্ষা একে অন্যের প্রতিপক্ষ নয়। তাই এখানে কোথাও যদি মনে হয় দুটো জিনিস একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয়ে গেছে তাহলে সেটাকে নিজ গুণে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ থাকলো।
চাকরি হলো জীবিকা। উচ্চশিক্ষা হলো আরেকটা চাকরিতে যাওয়ার জন্য অতিরিক্ত পড়াশোনা। এই সহজ ব্যাপারটা কেউ না বুঝতে পেরে একে অন্যের সাথে কমেন্ট যুদ্ধে লেগে পড়েন। প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিক্ষিত মানুষদের এরকম লেইম টপিকে ঝগড়া মানায় না।
প্রশ্ন হলো, বিদেশে উচ্চশিক্ষা কেন নিতে হয়? আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা যদি সেই মানের হতো তাহলে কি এত স্টুডেন্ট বিদেশে যেত পড়তে? অবশ্যই না। বরং তখন বিতর্ক হতো ব্যাংক/ সিভিল সার্ভিস বনাম বিজ্ঞানী/ রিসার্চার হওয়া নিয়ে। যেহেতু দেশের উচ্চশিক্ষা দিয়ে আমেরিকায় চাকরির সম্ভবনা খুব কম তাই এখন বিতর্ক চলে চাকরি বনাম বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে।
আমাদের দেশে প্রধান তিন ক্যাটাগরির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। পাবলিক, প্রাইভেট, ন্যাশনাল। অনার্সে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম এক/ দুই বছর এই তিন ক্যাটাগরির স্টুডেন্টদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ এই নিয়ে এক প্রকার ফেসবুকে/ ক্ষেত্র বিশেষে সশরীরেও যুদ্ধ চলে। যারা এই স্টেজ পার হয়ে এসেছেন তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ক্যারিয়ার গড়ার জন্য স্কিলটাই আসল। আজকালকার কর্পোরেট পৃথিবীতে স্কিল ছাড়া কেউ মূল্য দেবে না।
প্রথম/ দ্বিতীয় বর্ষের এসব বেহুদা প্যাঁচাল পার হলেই মাথায় চেপে বসে ক্যারিয়ারের চিন্তা। ট্রেডিশনাল চাকরি তো আছেই, জীবনে একবারও উচ্চশিক্ষা নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেননি এমন স্টুডেন্ট খুব কমই আছে। ছোটবেলায় যখন বাবা-মা বলতেন, আমার ছেলে/ মেয়ে বড় ডাক্তার/ ব্যারিস্টার হবে সেখানেও কিন্তু inherently হায়ার স্টাডির কথাই ছিল। বড় কিছু হতে হলে আপনাকে বড় ডিগ্রি নিতে হবে।
কিন্তু ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখার পরেও কেন এত কম স্টুডেন্ট হায়ার স্টাডিতে আসছেন? এটার একমাত্র উত্তর বোধহয় 'বাস্তবতার জন্য '। একটু পরেই দেখা যাক, বাস্তবতাগুলো কি কি হতে পারে।
আমাদের একটা বড় সমস্যা তুলনা করা। এই তুলনা চলে ক্যাডার বনাম ক্যাডার, ক্যাডার বনাম ব্যাংকার, ক্যাডার বনাম প্রাইভেট চাকরি, উচ্চশিক্ষায় দেশ বনাম দেশ, স্টেম বনাম নন স্টেম। উচ্চশিক্ষা বা চাকরি- যেখানেই যান না কেন, নিজের সাথে অন্যদের এই তুলনা বন্ধ না করলে আল্টিমেট সেটিসফেকশন কখনোই পাওয়া সম্ভব নয়।
হায়ার স্টাডিতে আসতে চাইলে ভুলে যান - আগামী পাঁচ বছরে আপনার ক্যাডার বন্ধুর কতগুলো প্রমোশন হয়েছে, তার কথার পাওয়ার কত, তারা কত দামি গাড়িতে চড়ছে। এসব জিনিস উচ্চশিক্ষার পরে আপনার পক্ষেও পাওয়া সম্ভব। আপনি যখন বিদেশের একটা ভার্সিটির ল্যাবে গবেষণা করছেন কিভাবে একটা মহামারী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, আপনার সহকারী কমিশনার বন্ধু চিন্তা করছেন কিভাবে তার এলাকায় চাইল্ড ম্যারেজ রোধ করা যায়। আপনিও গবেষণা করেছেন, বেতন পাচ্ছেন। তিনিও গবেষণা করছেন, বেতন পাচ্ছেন। গবেষণার ক্ষেত্র এবং ধরণটা শুধুমাত্র আলাদা। সবই মানুষেরই কাজে লাগছে। কাজেই এখানে কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়। আপনাকে আপনার ক্ষেত্র খুঁজে নিতে হবে।
হায়ার স্টাডি বনাম চাকরি - থার্ড/ ফোর্থ ইয়ারে ডিসিশন নেওয়ার সময় কোন ফ্যাক্টরগুলো চিন্তা করা যেতে পারে? বেশিরভাগ মানুষ এটার উত্তর দেবে - এত চিন্তা করে কি লাভ? তুমি যেটা হতে চাও সেদিকেই যাও। কিন্তু বাস্তবতা কি আসলেই সেরকম? স্টেপ বাই স্টেপ চিন্তা করুন। এই ডিসিশন নেওয়ার সময় যেসব প্রশ্ন নিজের কাছে করা যেতে পারে -
১. আপনার কি ফ্যামিলি বার্ডেন আছে? পরিবারকে আর্থিকভাবে অথবা সশরীরে সাপোর্ট করতে হয়?
২. আপনার আর্থিক অবস্থা কি খুবই খারাপ? অন্তত ৪/৫ লাখ টাকা ম্যানেজ করাটাও কষ্টকর?
৩. আপনি কি কোনো ভদ্রলোক/ ভদ্রমহিলার প্রতি কমিটেড?
৪. আপনি কি ঝুঁকি নিতে ভয় পান? একেবারেই সিকিউরড লাইফ আপনার পছন্দ?
৫. পড়াশোনা কি শুধুমাত্র ডিগ্রি পাওয়ার জন্যই করেছেন? নতুন আইডিয়ার ব্যাপারে চিন্তা করতে আলসেমি লাগে?
৬. আপনি কি হতাশা একদমই সহ্য করতে পারেন না?
৭. আপনি কি সিকিউরড লাইফ এবং চাকরি দুটোই চাচ্ছেন?
৮. কম সিজিপিএ র জন্য গর্তে লুকিয়ে আছেন?
সম্ভাব্য উত্তরগুলো হতে পারে:
১. ফ্যামিলি বার্ডেনের কারণেই বেশিরভাগ স্টুডেন্ট ইচ্ছা/ সামর্থ্য থাকার পরেও উচ্চশিক্ষায় যেতে পারে না। আর্থিক সমস্যার সমাধান হতে পারে এভাবে -
আমেরিকায় ফুল ফান্ড পেয়ে স্টুডেন্ট থাকাকালীন সময়ে আপনি প্রতি মাসে কিছু স্টাইপেন্ড পাবেন। এর পরিমাণ ১০০০ থেকে ২০০০ ডলার বা এরও বেশি হতে পারে। কৃপণভাবে চললে আপনি মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দেশে পাঠাতে পারবেন। সেইসাথে বিনা খরচে ডিগ্রিটাও পেয়ে যাবেন।
অনেকের বাবা, মা এবং পরিবারের অন্য সদস্য অসুস্থ থাকেন সশরীরে পরিবারকে সাপোর্ট দিতে হয়। সেক্ষেত্রে পরামর্শ থাকবে দেশেই ক্যারিয়ার গড়তে। প্যাশন থাকলে পরবর্তীতে জীবনের যেকোনো পর্যায়ে আপনি উচ্চশিক্ষায় যেতে পারবেন।
২. আমেরিকায় ফুল ফান্ড পেলে সেখানকার মাটিতে পা রাখতে খরচ হতে পারে গড়ে ৩ থেকে ৪.৫ লাখ টাকার মতো। অনেকের পক্ষেই এত টাকা একবারে জোগাড় করা সম্ভব হয় না। এই টাকা একবারে জোগাড় করার প্রয়োজন হয় না। প্রায় ৭/৮ মাস ধরে এই পরিমাণ টাকা আপনাকে খরচ করতে হবে। সো, কিছুটা ফ্লেক্সিবিলিটি আছেই।
যারা অনার্স থেকেই হায়ার স্টাডির প্রতি প্যাশন আছে তারা কিছু কিছু কাজ আগেই গুছিয়ে রাখতে পারেন। যেমন: থার্ড/ ফোর্থ ইয়ারে জি আর ই, মাস্টার্সে আইইএলটিএস ইত্যাদি। এভাবে স্টুডেন্ট লাইফেই প্রায় ৩৪ হাজার টাকার কাজ সেরে রাখতে পারবেন।
৩. এটা অনেকের কাছেই হায়ার স্টাডিতে যেতে একটা বড় বাধা। সেজন্যই এটা লিখেছি। এটার সমাধান যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
তবে এটুকু উল্লেখ করা যেতে পারে, আপনি কারো প্রতি কমিটেড থাকলে বিয়ের পরেও তাকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব (F-2 ভিসা)। এতে আপনার পার্টনারের জন্য হয়তো ৪/৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখানো লাগতে পারে। উল্লেখ্য, এই টাকাটা কিন্তু ব্লক মানি নয়। ভিসা ইন্টারভিউর পরেই এই টাকাটা আপনি ব্যাংক থেকে তুলে নিতে পারবেন।
৪. বিদেশের জীবন অনিশ্চয়তার। হয়তো ফুল ফান্ড পেয়েই আমেরিকায় আসবেন। এমনও হতে পারে মিনিমাম গ্রেড (৩.০০) মেইনটেইন করার কারণে আপনার ফান্ড কেড়ে নেওয়া হতে পারে। পিএইচডি তে ড্রপ আউট হতে পারেন। পড়াশোনা শেষে সহজে চাকরি নাও পেতে পারেন। যদি এসব অনিশ্চয়তা মেনে না নিতে পারেন তবে দেশেই ক্যারিয়ার গড়া ভালো।
৫. গ্র্যাজুয়েট রিসার্চের মূল উপাদান হলো আইডিয়া। আমাদের দেশে মাস্টার্স মূলত taught কোর্স ( যেখানে থিসিস আছে সেগুলো বাদে)। এই taught কোর্স পাশ করে যদি আপনি ভাবেন হায়ার স্টাডিটাও এরকমই তাহলে ভুল ভাবছেন। আমেরিকায় গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের প্রচুর রিসার্চ করতে হয়। রিসার্চ মানেই আইডিয়া। সেই ফ্লো চার্ট নিশ্চয়ই মনে আছে -
আইডিয়া/ হাইপোথিসিস-- এক্সপেরিমেন্ট -- রেজাল্ট -- ফেইল/ সাকসেস --- নিউ আইডিয়া
সো, নিত্য নতুন আইডিয়া নিয়ে কথা বলতে যদি আপনার ক্লান্তি লাগে তাহলে উচ্চশিক্ষায় ভালো করা কঠিন।
৬. গ্র্যাজুয়েট স্কুল কঠিন জায়গা। অনেক সময় আপনার এমন মনে হবে একই জায়গায় দিনের পর দিন পড়ে আছেন। সেইসাথে প্রফেসর বিরূপ হলে তো কথাই নেই। সেইসাথে আছে পেপার রিজেকশন। সো, অল্পতেই হতাশ হলে গ্র্যাজুয়েট স্কুল আপনার জন্য নয়। তবে এটা হায়ার স্টাডিতে আসার পথে তেমন কোনো বাধাও নয়। একটা সময় পর এগুলো অভ্যেস হয়ে যায়।
৭. চাকরি এবং উচ্চশিক্ষা দুটোই করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সিভিল সার্ভিস এটার জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা। চাকরি থেকে ছুটি নিয়েই আপনি সরকারি সাহায্য নিয়ে বিদেশে পড়তে যেতে পারবেন।
তবে এই স্ট্র্যাটেজিতে কিছু ঝুঁকি আছে। এসব চাকরি যে পাবেনই এটা খুবই অনিশ্চিত। আপনি তিন/ চার বছর এসব চাকরির পিছনে ঘুরেও ব্যর্থ হলে এই সময়টা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে। ততদিনে আপনি হয়তো পিএইচডি শেষ করে ফেলতে পারতেন। তাই এই সিদ্ধান্ত বুঝেশুনে নিন।
৮. কম সিজিপিএ নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি নিজেই ক্লান্ত। এতদিনে কম সিজিপিএ নিয়েও ফান্ড পাওয়া স্টুডেন্টদের অনেক প্রোফাইল শেয়ার করেছি।
শুধু এটুকু মনে রাখবেন, আমেরিকা ট্যালেন্ট মানুষদের জন্য। আমেরিকার রাস্তায় ডলার না উড়লেও সুযোগ উড়ে।
কম সিজিপিএ নিয়েও আপনি যদি অন্যান্য দিক ভালো করতে পারেন, নিজের স্কিল বাড়াতে পারেন এবং দিনের পর দিন হতাশা সহ্য করে লেগে থাকতে পারেন তাহলে আপনিও ফান্ডসহ এডমিশন পেতে পারেন। কাজেই, কম সিজিপিএ হায়ার স্টাডির ক্ষেত্রে বড় কোনো বাধা নয়।
এবার সর্বশেষ কথা, আপনার প্যাশন। প্যাশন থাকলে আপনি ৪০ বছর বয়সেও উচ্চশিক্ষায় আসতে পারেন। প্যাশনের সাথে কিছু বাস্তবতাকে মেলাতে পারলেই নিজের ক্ষেত্র খুঁজে বের করা কঠিন কিছু নয়। শুধু এটুকু খেয়াল রাখা উচিৎ, কোনো কিছুর প্রলোভনে পড়ে সেদিকে নিজের ক্যারিয়ার সিলেক্ট করা অনুচিত। কারণ, প্রলোভনের শেষ নেই। একটা গেলে আরেকটা আসে। সিভিল সার্ভিসে বেশ পাওয়ার আছে, সুযোগ সুবিধা আছে এটা ভেবে হায়ার স্টাডির প্রতি নিজের প্যাশনকে ত্যাগ করবেন না। আবার সিনিয়ররা বিদেশ গিয়ে কনভার্টিবল ড্রাইভ করছে, হাইকিং করছে এসব আকর্ষণীয় ছবি দেখে হুট করে হায়ার স্টাডিতে আসা আসবেন না।
Credit: Shamim Sharif. Nextop USA Group