22/07/2023
মোক্ষলাভ বা নির্বান লাভ বুদ্ধের একটা দারুণ কন্সেপ্ট। আমাকে একবার এক ছোটভাই প্রশ্ন করেছিল নির্বান লাভের উপায় কী? উত্তরে বলেছিলাম কঠিন, এত সহজে নির্বান লাভ সম্ভব নয়। অথচ সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে জাস্ট মাথায় এসে গেল নির্বান লাভের রাস্তা।
মজা করে একজনকে বললাম যে পথে ধানমন্ডি যাওয়া যায়, সেই একই পথে মোক্ষলাভ হয়।
আসলেই ব্যাপারটা তেমন, নির্বান বা মোক্ষলাভ হচ্ছে মোহাম্মদপুর থেকে ধানমন্ডি যাওয়ার মতই নিজের অবস্থানের পরিবর্তন। না ফিজিক্যাল অবস্থান নয়, বরং নিজেকে যদি এনার্জি হিসেবে ধরা যায় তাহলে সেই এনার্জিকে নেগেটিভ এনার্জি থেকে পজিটিভ এনার্জিতে রুপান্তর করাই নির্বান লাভ।
নির্বান লাভের আগে নির্বান কি তা জানা জরুরী। নির্বান হচ্ছে এমন এক অবস্থা যেখানে কোন জরা নেই, ব্যাধি নেই, শোক নেই, জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। সোজা ভাষায় একদম নাথিংনেস; এ্যাবসলুট জিরো।
জন্মালে মরতে হবে তাহলে নির্বান কিভাবে হবে? মৃত্যুই কি তাহলে নির্বান? আমার কাছে এই দর্শন একটু ভিন্ন। নির্বান লাভ হচ্ছে রিপুর উপর নিয়ন্ত্রন। আমরা জানি রিপু হচ্ছে ছয়টি যাকে একত্রে ষড়রিপু বলা হয়।
কাম বা ইন্দ্রিয়সুখ, ক্রোধ বা রাগ, লোভ, মোহ, মদ বা অহংকার, মাৎসোর্য বা হিংসা।
সিদ্ধার্থ যখন ঘর ছেড়ে সন্নাস নে তখন ঘরে তার সুন্দরী স্ত্রী যশোধরা। একজন বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত পুরুষ উভয়ের জন্যেই নিজের যৌন ইচ্ছাকে বশে আনা বেশ কঠিন, যে পুরুষ নিজের ইন্দ্রিয়সুখ বশে আনতে পারে তার কাছে নারীকূল সুরক্ষিত। অর্থ্যাৎ একটা পাপের আশঙ্কা কমে যেয়ে সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা একই সাথে স্রষ্টার আনুগত্যের সহজতম পথ বের হয়ে আসে (এক্ষেত্রে ভুলে যান বুদ্ধ ইশ্বরে বিশ্বাস করতেন না)। এরপর আসে রাগ বা ক্রোধ। জগতে সকল অপরাধের গোড়পত্তন হয় রাগ বা ক্রোধ থেকে। এই ক্রোধ চরম মাত্রায় পৌছালে নরহত্যার মত গুরুতর ঘটনা ঘটে যায়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সে ব্যক্তি শক্তিশালী নয়, যে ব্যক্তি কুস্তি লড়ে অন্যকে ধরাশায়ী করে, বরং প্রকৃতপক্ষে সে ব্যক্তিই শক্তিশালী, যে রাগের সময় নিজেকে সংবরণ করতে পারে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৮০৯)
লোভ নিজের ব্যাক্তিসুখ থেকে শুরু করে আরো বড় অপরাধের জন্ম দেয়। লোভের কারণে গোটা একটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়, একটা রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। শেক্সপীয়রের ম্যাকবেথ এর কাহীনিই দেখেন না! কিভাবে লোভ একের পর এক অঘটনার জন্ম দিয়ে পুরো একটা রাজ্যকে ধ্বংস করে দেয়। লোভ ব্যাক্তি, সমাজ, সংসারে কিভাবে অশান্তি আনে তা ব্যাখা দেয়ার খুব বেশী প্রয়োজন নেই।
মোহ বা মায়া হচ্ছে যা আমাদের বিভ্রান্ত করে তোলে। নিজের চেয়ে অন্যের প্রতি অধিকা ভালোবাসাও এক প্রকার মোহ। আধুনিক কালে মোহের অর্থে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মোহকে ধরা যেতে পারে বিভ্রান্ত হয়ে মিথ্যা বলা কিংবা অপরাধ ঘটনার প্রবণতার সৃষ্টিকারী হিসেবে।
অহংকার যেমন অন্যকে কষ্ট দেয় ঠিক একইভাবে নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্চিন্য করে কঠিন মানুষের রুপান্তর করে। সোশ্যাল ইন্টার এ্যাকশন ছাড়া একজন মানুষ সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকতে পারেনা। অহংকারী মানুষ প্রথমে অন্যকে কষ্ট দেয় এরপর থেকে নিজে বিচ্ছিন্য হয়ে কষ্ট পাওয়া শুরু করে। হিন্দু শিবপূরানে আত্মাকে কষ্ট দেয় এমন পাঁচটি জিনিসের মধ্যে অহংকার অন্যতম।
মাৎসোর্য্য বা ঈর্ষা হচ্ছে এমন সব ম্যাটারিয়ালিস্ট ব্যাপার যেগুলো একদমই বস্তুগত এবং প্রয়োজনের থেকে অধিক কিন্তু দরকার নয় এমন বিষয় কেন্দ্র করে বা আকড়ে ধরে বেঁচে থাকার প্রবণতা এবং অন্যের সাথে ভাগ না করতে চাওয়া। যেমন সম্পদ, জমি জমা ইত্যাদি। আধুনিক কালে ঈর্ষার সঙ্গায়নের পরিধিও বেড়েছে। আপনার কাছের কোন বন্ধুর অর্থনৈতিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে যেটা আপনি সহ্য করতে পারছেন না, এই যে বস্তুবাদী একটা পরিবর্তন আপনার সহ্য হচ্ছেনা এটাও ঈর্ষা।
এই ষড়রিপু নিয়ন্ত্রন করতে পারলে আপনি আমি মানুষ হিসেবে শুদ্ধ। জীবাত্মা তখন পরমাত্মার সাথে মিলে যাওয়ার সুযোগ পায়। আর পরমাত্মা হচ্ছে সামথিং ইন নাথিংনেস। পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার সংযোগই ডিভাইন লাভ। লাভ টুয়ার্ডস গড। ঠিক তখনই স্রষ্টাকে পাওয়া যায়। রিপুর নিয়ন্ত্রন ইবাদতে পূর্ণতা দান করে।