23/08/2020
ঘটনা একঃ
মাসখানেক আগে আমার লিষ্টের একটা মেয়ে আমাকে নক দিয়ে জানালেন, তার রান্না বান্নার ইউটিউব চ্যানেলে সাবসক্রাইবার তেমন একটা নেই, অথচ তার ভুলটা কোথায় তিনি ধরতে পারছেন না।
কত ওগা মগা ভিডিওর ভিউ লাখ ছাড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ তার ভিডিওতে ভিউ হয় মোটে কয়েক শত। কথা প্রসংগে সে জানালো, তার ফেসবুক পেইজ বুষ্টিংয়ের দায়িত্ব স্থানীয় একটা পাতি এজেন্সিকে দিয়েছে। তারা বলেছে, তার পেইজের জন্য তারা ”কুটি কুটি” লাইক-শেয়ার এনে দেবে।
তো কয়েকদিন পর তার পেইজে গিয়ে তো তার চক্ষু চড়কগাছ!
তার রান্না-বান্নার পেইজে একটা পোষ্ট পিনড করে রাখা। সেটার হেডলাইনে লেখা “৬ বছরের শিশুকে যৌন নির্যাতন করলো এই যুগল। বিচার চাইতে লাইক দিন।” সেখানে ৪ দিনে পড়েছে প্রায় ৯০০ লাইক। ক্রদ্ধ অডিয়েন্স এই অপরাধের বিচার চাইতে ধুমায়া লাইক শেয়ার দিচ্ছে।
তারা তাদের কথা রেখেছে, লাইক-শেয়ার তো এনে দিয়েছে।
পেইজের এডমিন মেয়েটা হতভম্ব হয়ে পেইজ থেকে ঐ পোষ্ট ডিলিট করে দিলো, এরপর এডমিন রোল থেকে এজেন্সিকে রিমুভ করলো। তারপর ফোন দিয়ে বকাঝকা করলো।
কিন্তু ততক্ষনে মানুষজন তাকে ইনবক্সে নক করা শুরু করেছে - ”আপা, ঐ পোষ্টটা কই? / রিমুভ করছেন কেন? / টাকা খেয়ে রিমুভ করেছেন, বুঝসি! / আপনাদের মত ধান্ধাবাজ দুই নম্বরের জন্যই দেশে আজ কোন অপরাধের বিচার হয় না।” ইত্যাদি ইত্যাদি।
ঐ মেয়েটার তখন মানসিক অবস্থাটা বুঝেন। একদিকে এতদিন ধরে গড়ে তোলা তার পেইজের সুনামটা নষ্ট হল, অন্যদিকে তার ফেসবুক বুষ্টিংয়ের টাকাটা জলে গেলো, আবার এখন ইনবক্সে সবাইকে পুরো ঘটনা বুঝিয়েও রিপ্লাই দিতে হচ্ছে যে, এইটা তার বুষ্টিং এজেন্সি ভুল করে পোষ্ট করেছে, যেটা তার পোষ্ট করার কথা ছিলো না।
এইরকম ঘটনা আমি এরপরেও আরো দুইবার শুনেছি দুইটা পেইজের এডমিনের মুখ থেকে। প্রায় হুবহু একই ঘটনা। আমি নিশ্চিত, আরো অনেকের সাথেই ঘটছে এইরকম ঘটনা।
এই ঘটনার জন্য কারা দায়ী?
দায়ী ভুইঁভোড় এজেন্সিগুলো, যারা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের নামে আপনার ই-কমার্স সাইটের ফেসবুক বুষ্টিং করে থাকে, যার হেডিং থাকে “আপনার প্রেমিকার বুক দেখে বলে দিন সে সতী না অসতী!”🙂
আর পেইজের এডমিনদের প্রতি অনুরোধ, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা পেইজের মেট্রিক ফিগার দেখা বন্ধ করেন। লাইক-কমেন্ট-শেয়ার দিয়ে আপনার হিন্দী চুলটাও হবে না, যদি না কনভারসেশন হয়। মানে যদি না আপনার সেল আসে।
পেইজ থেকে আপনার টাকা ইনকাম না হলে কি এনগেইজমেন্ট ধুয়ে পানি খাবেন? তাই - এজেন্সি যখন বলে যে তারা কুটি কুটি লাইক-শেয়ার এনে দিবে, তখন তাদেরকে জিগেস করেন যে কিভাবে তারা এনে দিবে, সেই সাথে তাদের আগের কাজগুলো দেখতে চান। পোর্টফোলিও দেখেন, লাইভ স্যাম্পেল দেখেন। তাদের স্ট্রাটেজি কি জিগেস করেন, তার আগে কাজ দিয়েন না।
যদি দেন তো উপরের ঘটনার মত হবে অবস্থা।🙂
ঘটনা দুইঃ
কিছুদিন আগে দুজন লোকের সাথে কথা হলো। একজন একটা সরকারী ই-কমার্স প্রজেক্টের দায়িত্বে আছে, আরেকজন চীনে থাকে, একটা স্টার্টাপ দাড়ঁ করানোর ট্রাই করছে একটা দারুন হেলথ প্রডাক্ট নিয়ে।
দুজনেই আমাকে নক করেছেন ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়ে সাহায্য চাইতে। এইরকম বেশ কয়েকটা নক আমি প্রায় প্রতিদিনই পাই। আমি আগ্রহ নিয়ে তাদেরকে সময় দেই। তাদের সমস্যা শুনি ও সমাধান বাতলে দেবার চেষ্টা করি।
তো প্রথমজন তার বন্ধুর এজেন্সি থেকে কোটেশন নিয়েছেন। বন্ধু তাকে ডিজিটাল মার্কেটিং বাবদ প্রায় ৭৫ হাজার টাকার কোটেশন দিয়েছেন। সেখানে মূলতঃ শুধু ফেসবুক বুষ্টিং এর কথা লেখা।
আমি তাকে বল্লাম - আপনার যে প্রডাক্ট, যদি স্পেসিফিকলি বলি তবে এটাকে বিক্রি করতে হলে আপনার লাগবে সার্চ ইঞ্জিন মার্কেটিং, যেটা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের জগতে এক কথায় ”গুগল এডস” নামে পরিচিত।
আপনি গুগলে এইটা লিখে সার্চ দিলেই শত শত আর্টিকেল আর ভিডিও পাবেন। আপনি যেহেতু শিক্ষিত ও আধুনিক মানুষ, সেহেতু মাত্র আধা ঘন্টা টাইম দিলেই মুটামুটি আপনার বুঝে এসে যাবে এই জিনিস কি এবং কিভাবে কাজ করে!
ডিজিটাল এজেন্সি হায়ার করার আগে এই নলেজটুকু আপনার কাজে লাগবে। আপনার বন্ধুর দেয়া কোটেশনে আপনার কাজ অতটা হবে না, যতটা আপনাকে চার্জ করা হবে। আপনি বরং তাকে বলেন যে, ফেসবুক বুষ্টিংয়ের বাজেট কমিয়ে সবচে বড় বাজেটটা গুগল এডসে রাখতে।
সে অবাক বিস্ময়ে জানালো, ”এই কথা আমাকে কেউ আগে বলে নাই প্রলয় ভাই। কেন ভাই?” আমি বল্লাম - ”হয়তো তারা গুগল এডসে এক্সপার্ট নয়, কিংবা তারা এই কাজ করতে আগ্রহী নয়।
কারণ লোকে এখন ডিজিটাল মার্কেটিং বলতে শুধু ফেসবুক বুষ্টিংই বুঝে, এই ধান্ধায় কম পরিশ্রম, কিন্তু লাভ বেশী! তাই কেউ আর গুগল বা বিং এডসে যেতে চায় না, কারণ ওখানে টাকা যেমন বেশী, পরিশ্রমও অনেক বেশী।
অথচ আপনি যদি র্যাংকিং করেন, তবে কোর ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের তালিকায় পয়লা নম্বরেই থাকে সার্চ ইঞ্চিন মার্কেটিং! তারা যেটা জানে না, অথবা আপনাকে জানাতে চায় না।”
২য় জনের অবস্থাও তথৈবচ।
সে ”নামের সাথেই সামাজিক শব্দটা আছে” এমন একটা লোকাল এড এজেন্সি থেকে কোটেশন নিয়েছে। ঐ এজেন্সি উক্ত ভদ্রলোককে স্রেফ ৫ লাখ ফেসবুক লাইকের জন্য কোট করেছে ১৭ লাখ টাকা। তারপর ভ্যাট ট্যাক্সসহ আরো কিছু মিলিয়ে সেটাকে প্রায় ২৪ লাখ বানিয়ে কোটেশন সাবমিট করে দিয়েছে। অথচ এর অর্ধেক বাজেট দিয়ে তিনি এর চাইতে বেটার আউটপুট পেতেন জাষ্ট ”গুগল এডস” ব্যবহার করে!
আমি তার কোটেশন দেখে হতভম্ব!
২৪ লাখ টাকার কোটেশন অথচ সেখানে নেই কোন SEM, SMM, or Remarketing or Content Marketing!! মানে ব্যাপারটা এমন যেন আপনি বিয়ের বাজার করতে গেছেন, ৫০০ লোক খাওয়াবেন, অথচ বার্বুচি আপনাকে স্রেফ জর্দ্দা আর বোরহানির কোটেশনই দিয়ে দিয়েছে ২৪ লাখ টাকার!
ছোট খাটো এড এজেন্সি হলে পাত্তা দিতাম না, ধরে নিতাম লোকাল ক্লায়েন্ট ঠকানোই এদের কাজ।
কিন্তু উক্ত এজেন্সির মুটামুটি চিন পরিচয় আছে, তারাও যে এইরকম করে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের নামে সোশ্যাল মিডিয়া বায়িং করে ক্লায়েন্টদের এত বড় বাজেট ধরিয়ে দিচ্ছে, এটা কখনই ভাবিনি।
এতে করে সবচাইতে বড় ক্ষতিটা হচ্ছে সত্যিকার যারা ডিজিটাল মার্কেটিং সেবা দেয়, তাদের।
তো আসেন দেখি, ফেসবুক বুষ্টিং ছাড়াও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আর কি কি জিনিসপাতি আছে?
Google Ads / GDN (Google Display Network) Advertising
Remarketing (Search, Display, Video, Social)
PPC Ad (Google + Social)
SMM (Social Media Marketing)
Content Marketing
Email Marketing
Affiliated Marketing
Social Media Advertising
Conversion Rate Optimization
SEO
এখন, ডিজিটাল মার্কেটিং বলতে যারা ফেসবুক বুষ্টিং বুঝে থাকেন, তাদের জন্য বলছি যে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে এর স্থান কোন জাগায়?
ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটা শাখা হচ্ছে Social Media Marketing। আর সেটার একটা প্রশাখা হচ্ছে ফেসবুক বুষ্টিং! এবার নিজেরাই বুঝে নেন যে, ফেসবুকে স্রেফ ১০/২০ ডলারের ক্যাম্পেইন রান করে আপনারা আসলে কোন লেভেলের ডিজিটাল মার্কেটিং করতেছেন!😄
আমি ফেসবুক বুষ্টিং করার বিপক্ষে নই। কিন্তু ফেসবুক যদি বুষ্টিং করতেই হয়, তবে সেটা সেই নামেই ডাকেন, কিংবা নিদেনপক্ষে Social Media Advertising বলেন। কিন্তু ডিজিটাল মার্কেটিং বইলেন না প্লিজ।
তথাকথিত এড এজেন্সিগুলো দেশীয় ক্লায়েন্টদের মাথায় কাঠাঁল ভেংগে খাচ্ছে তাদেরকে বোকা পেয়ে, কিন্তু দেশীয় ক্লায়েন্টরা তো আর আজীবন বোকা থাকবে না। তারা এক সময় বুঝবে যে তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছিলো, তখন এজেন্সিগুলো কি করবে? নতুন আরেক ধান্ধা নিয়ে আসবে? কিন্তু এইরকম ধান্ধাবাজি করে মার্কেটে কয় বছর টিকে থাকা যাবে, ব্রো?
উপরে যে কয়টা লিখলাম তার প্রতিটা নিয়ে আপনি টানা ১ বছর ধরে পড়াশোনা করলেও এর সবটা শিখে উঠতে পারবেন না, এতটাই গভীর ডিজিটাল মার্কেটিং! আমি নিজেও এখনো কনটেন্ট মার্কেটিং এর পুরোটা শিখে শেষ করতে পারিনি, অথচ গত ৩ বছর ধরে শিখে যাইতেছি।
যারা ডিজিটাল মার্কেটিং সেবা নিতে যান, তাদেরকে একান্ত অনুরোধ - এজেন্সিকে হায়ার করার আগে একটু কষ্ট করে গুগলে সার্চ দিবেন।
আমার নিজের হাতে লেখা খুব গোছানো একটা আর্টিকেল আছে, যেটার লিংক কমেন্টে দিবো পোষ্ট এপ্রুভ হবার পর! কখন হবে কে জানে? এডমিনরা যদি আমার পোষ্টগুলোকে অটো এপ্রুভালের আওতায় নিয়ে আসে, তাহলে ভালো হয়- কারণ আমার পোষ্টে সাধারনত প্রচুর রেফারেন্স, লিংক-টিংক এইসব থাকে যেগুলো কমেন্টে দিতে হয়।
যা হোক, আর্টিকেলের নামঃ
You Should Get The Answers to These 10 Questions Before Hiring A PPC Agency.
(কোন পিপিসি এজেন্সিকে কাজ দেবার আগে যে ১০টি প্রশ্নের উত্তর জেনে নিবেন)
ওটা পড়ে মুটামুটি একটা আইডিয়া পাওয়া যেতে পারে যে, কোনো ডিজিটাল এজেন্সিকে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কাজ দেবার আগে ঐ এজেন্সিকে ঠিক কিভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
আমি একদম সহজবোধ্য ভাষায়, টু দা পয়েন্টে আলোচনা করেছি। তারপরেও কেউ যদি কোন জাগায় এসে না বুঝেন, আমাকে নক দেবার অনুরোধ রইলো। এটাকে অনুবাদ করে বাংলাতে প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে।
আপনাদের হেল্প করার জন্য আমি এনি টাইম প্রস্তুত। তবু প্লিজ - ফর গড সেইক - ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের নামে ফেসবুক বুষ্টিংয়ের পেছনে লাখ লাখ টাকা অনর্থক ঢালবেন না। কোন ”ফেবু-বুষ্টিং এজেন্সি” যদি চায়ও আপনাকে বোকা বানাতে, আপনি তাদেরকে কেন সে সুযোগ দিবেন, বলেন?
আমি জানি, সরাসরি এত কিছু লেখার ফলে অনেক ডিজিটাল এজেন্সিরই আমি চক্ষুশূল হয়ে যাবো। কিন্তু তবু আমি চাই আর একটা ক্লায়েন্টও না ঠকুক।
ক্লায়েন্ট বোকা নয়। কখনই নয়।
আমার খুব প্রিয় একজন দেশীয় মার্কেটার বলেছিলেনঃ
”একজন মার্কেটারের ওয়ান অব দ্য মোষ্ট ডেডলিয়েষ্ট মিসটেক হচ্ছে, তার ক্লায়েন্ট বা টিজিকে বোকা ভাবা, বা আন্ডারএস্টিমেট করা।
আমি আমার দীর্ঘ ১৮ বছরের মার্কেটিং ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, কাস্টমাররা বোকা নয়। তারা সচেতন, বুদ্ধিমান, এবং শিক্ষিত।
তাদেরকে যদি বোকা ভাবেন, তাহলে এই ভুলের খুব চড়া মাশুল আপনাকে দিতে হতে পারে।”
© এই লেখাটির সত্ত্ব আমি প্রলয় হাসান এককভাবে সংরক্ষণ করি। আমার লিখিত অনুমতি ব্যতিত এর কোন অংশ নকল করা কপিরাইট এ্যাক্ট ২০০১ এর অধীনে দন্ডনীয় অপরাধ।
[এই নোটিশ টাঙ্গিয়েও আসলে কোন লাভ হয় না, আমার লেখাচোরদের সংখ্যা বেড়েছে বৈ কমেনি! ফেবুর অসংখ্য পেইজ আর গ্রুপে আমার লেখা কপি করে পাবলিশ করা হয়, কেউ যদি দয়া করে কার্টেসি দেয় তো দিলো, নয়তো নিজের নামে কিংবা কালেকটেড কিংবা কোন কিছু না লিখেই চালিয়ে দেয়। আমি খুবই হতাশ। :( ]