03/03/2026
ভালোবাসার মায়া: পাঠ - ১১
ড্রয়িংরুমের ঝলমলে আলো আর অনিকের অট্টহাসি আথনুকের কানে স্রেফ কান্নার শব্দের মতো বাজছে। যে পকেট থেকে গিফটটা বের করে ছায়ার পায়ে পরিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই পকেটটা এখন যেন সিসার মতো ভারী হয়ে গেছে। আথনুকের মা পরিস্থিতিটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু তাঁর চোখেমুখেও স্পষ্ট বিস্ময়। তিনি একবার ছেলের দিকে তাকাচ্ছেন, তো একবার ছায়ার দিকে। ছায়া আর অনিক তখন পাশাপাশি সোফায় বসে। অনিক দারুণ কথা বলতে পারে। সে আমেরিকার ল্যান্ডস্কেপ, ওখানকার জীবন আর ছায়ার সাথে তার দীর্ঘ তিন বছরের গোপন প্রেমের গল্প শোনাচ্ছে। ছায়া মাঝেমধ্যে আথনুকের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু সেই চাহনিতে এখন আর কোনো ‘ইশারা’ নেই, আছে স্রেফ এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
আথনুক, তোর গিফটটা বের করবি না? তুষার পাশ থেকে আবার খোঁচা দিল। ওর গলার স্বরে বিষাদ নাকি বিদ্রূপ ছিল, আথনুক বুঝতে পারল না।
আথনুক কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। পকেট থেকে গিফট বক্সটা বের করে সরাসরি অনিকের দিকে বাড়িয়ে দিল। ম্লান হেসে বলল, তোমাদের এনগেজমেন্টের কথা তো জানতাম না অনিক ভাই। এই সামান্য গিফটটা আপনাদের দুজনের জন্য। ছায়ার জন্য এনেছিলাম, তবে এখন মনে হচ্ছে এটা আপনাদের দুজনের জুটির জন্যই মানানসই। ছায়া অবাক হয়ে বক্সটা খুলল। ঝকঝকে রুপোর পায়েল জোড়া দেখে ওর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে আবেগী গলায় বলল, আথনুক! তুমি জানলে কী করে আমার পায়েল কত পছন্দ? অনিক দেখো, কী সুন্দর! অনিক আথনুকের হাত জড়িয়ে ধরে বলল, আপনি সত্যিই গ্রেট আথনুক ভাই। ছায়া ঠিকই বলত, আপনার মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।" প্রস্থানের প্রস্তুতি চা-নাস্তা শেষ করে আথনুক আর বেশিক্ষণ সেখানে স্থির থাকতে পারল না। প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে নরকবাসের মতো মনে হচ্ছিল। সে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। মা-ও বুঝলেন ছেলের মনের অবস্থা। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ছায়া দরজায় এসে দাঁড়াল। অনিক ভেতরে তুষারের সাথে কথা বলছে। ছায়া আথনুকের খুব কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, মন খারাপ করলে আথনুক? সারপ্রাইজটা বেশি বড় হয়ে গেল? আথনুক তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল, না রে ছায়া। সারপ্রাইজটা সত্যিই অভাবনীয় ছিল। সুখী হস।
সে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। তার মনে হলো, পেছন থেকে ছায়া তাকে ডাকবে, বলবে— "আরে ধুর পাগল, আমি মজা করছিলাম! কিন্তু কোনো ডাক এল না। বদলে কানে এল অনিক আর ছায়ার সম্মিলিত হাসির শব্দ।
নিস্তব্ধ রাত এবং একটি সিদ্ধান্ত
বাসায় ফিরে আথনুক নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। মা কয়েকবার ডাকতে এসেও ফিরে গেলেন। তিনি জানেন, এই ক্ষত মলম দিয়ে সারার নয়। আথনুক জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের আকাশটা আজ বড্ড মেঘলা।
সে টেবিলের ড্রয়ার থেকে সেই ডায়েরিটা বের করল, যেখানে সে 'আদ্রিতা'র নাম লিখেছিল। আজ প্রতিটি বর্ণ যেন তাকে বিদ্রূপ করছে। সে কলম তুলে ডায়েরির পাতায় শেষ কয়েকটা লাইন লিখল:
"ভালোবাসার মায়া বড় অদ্ভুত। কেউ মায়ায় পড়ে ঘর বাঁধে, আর কেউ মায়া কাটিয়ে আগন্তুক হয়ে যায়। ছায়া কোনোদিন আমার ছিল না, ও ছিল আমার একতরফা জেদ আর স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি মাত্র।"
হঠাৎ ওর ফোনে একটা মেসেজ এল। তুষারের মেসেজ। আথনুক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। তুষার লিখেছে: দোস্ত, কষ্ট পাস না। ছায়া আমাকে আগেই মানা করেছিল তোকে কিছু জানাতে। ও চেয়েছিল তুই যেন নিজের থেকেই সরে যাস। আজ অনিক আসত না, ছায়া নিজে ফোন করে ওকে আগেভাগে আনিয়েছে শুধু তোকে এটা বোঝাতে যে, তোদের রাস্তা আলাদা।
আথনুকের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল ডায়েরির পাতায় গিয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, ছায়া আসলে নিষ্ঠুর নয়, বরং অনেক বেশি বাস্তববাদী। সে মায়া বাড়াতে চায়নি বলেই মায়া ছিঁড়ে দিয়েছে।
সে আলমারি থেকে তার ব্যাগটা বের করল। অফিসের সেই প্রজেক্টটার জন্য তাকে চট্টগ্রাম যেতে বলা হয়েছিল, যা সে ছায়ার জন্য এতদিন এড়িয়ে গেছে। এখন আর কোনো পিছুটান নেই।