16/03/2025
উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনীতি হয়েছে ভাষাকে নিয়ে। মুসলিমরা আসার আগে এই উপমহাদেশ একক কোন রাষ্ট্র ছিল না। খন্ড খন্ড রাজ্য ছিল এক একটি দেশ। প্রতিটি রাজ্যে আলাদা আলাদা শাসক ছিল। সেই সব রাজ্যের ভাষাও ছিল আলাদা।
বলা হয় বাংলা ভাষার ইতিহাস হাজার বছরের। দলিল হিসেবে চর্যাপদকে উপস্থাপন করা হয়। চর্যাপদকে মূল ধরেই হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি কথাটার উদ্ভব। কিন্তু হিন্দি ভাষিরাও এটাকে তাদের ভাষার আদি নিদর্শন বলে দাবি করে। চর্যাপদে শুধু বাংলা ভাষা বা হিন্দি ভাষা নয় অহমিয়া, উড়িয়া, মৈথিলী ভাষারও উপকরণ পাওয়া যায়। কারণ এসব ভাষার মূল এক যাকে অপভ্রংশ বলা হয়। চর্যাপদের ভিতর উপরোক্ত সবগুলো ভাষার সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট, শব্দগত ও ব্যাকরণগত মিল পাওয়া যায়।
ফলে চর্যাপদ শুধুমাত্র বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন নয়। এতে বাংলা ভাষার কিছু নিদর্শন আছে, তার পাশাপাশি অন্যান্য ভাষারও নিদর্শন রয়েছে।
পরিপূর্ণ বাংলা অক্ষরে বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটে মূলত মুসলমান আমলে। কিন্তু সেই কালেও বাংলা ভাষার নাম বাংলা হয়নি। তাকে তখন মূলত বলা হত দেশি ভাষা।
মুসলমান আমলের কবি আব্দুল হাকিমের বিখ্যাত একটি কবিতার চরণ আছে সেটি হচ্ছে,
"দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়।
নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশ না যায়।"
কবি ভারতচন্দ্র বলেছেন,
"না রবে প্রাসাদগণ না হবে রসাল।
অতএব কই ভাষা যাবনী মিশাল।"
লেখক ফাহমিদ-উর-রহমান এই দুটি কবিতার চরণের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন, ভাষা অর্থে বাঙ্গালা বা বাঙ্গালি শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। বাঙালীত্বের ধারণা দেশভিত্তিক ভাষা ভিত্তিক নয়।
ফাহমিদুর রহমান দাবি করেন,
পর্তুগীজ পাদ্রী আস সুম্নসাঁও, পরে ইংরেজ নাথানিয়েল হ্যালহেড বাংলা ভাষার ব্যাকরণ লিখে বাংলা অর্থে বাঙ্গালীর ধারণাটা প্রচার করেন। পরে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে যখন বাংলা বই লেখা হতে থাকে অথবা শ্রীরামপুর প্রেস থেকে বই বের হতে থাকে তখনই ভাষা বুঝাতে বাঙ্গালা এবং ভাষা অর্থে বাঙ্গালী শব্দটা একটা বিশেষ অর্থ নিতে থাকে।
বাংলায় মুসলিমরা আসার আগে এই বাংলা প্রায় দুশো বছর শাসন করেছে আর্য হিন্দুরা, যারা ছিলো ব্রাহ্মণ। তখন তারা এই বাংলার আদি সন্তান বৌদ্ধ ধর্মীয় পাল আমলের দেশি ভাষা যা বর্তমানে বাংলা ভাষা নামে পরিচিত, তা বাদ দিয়ে সংস্কৃত ভাষার প্রচলন করে।
এ প্রসঙ্গে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ লিখেছেন,
"আমরা হিন্দু-কালের কোনো বাংলা সাহিত্য পাই নাই। হিন্দু সেন রাজগণ সংস্কৃতের উৎসাহদাতা ছিলেন। ব্রাহ্মণের ধর্মের সহিত সংশ্লিষ্ট বলিয়াই সম্ভবতঃ তাঁহারা বাংলা ভাষার প্রতি বিদ্বিষ্ট ছিলেন।"
এনামুল হক লিখেছেন,
"বাংলার শেষ হিন্দু রাজা ছিলেন লক্ষণ সেন। তাহার সভায় ধোয়ী, উমাপতি ধর, প্রভৃতি কবি এবং হলায়ুধ মিশ্র প্রভৃতি পণ্ডিত ছিলেন। কিন্তু নানা পণ্ডিত ও কবির সমাবেশে তাঁহার রাজধানীতে যে সংস্কৃত ভাষা চর্চার ও পাণ্ডিত্য প্রকাশের সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়িয়া উঠে, তাহা জয়দেবের গীত-গোবিন্দের মাধ্যমে সমগ্র উত্তর ভারতে প্রভাব বিস্তার করিলেও বাংলা ভাষা চর্চার কোনো আয়োজন তথায় ছিল না।"
এনামুল হক আরেকটি যায়গায় মতামত দিয়েছেন,
"১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কী বীর ইখতিয়ার বিন মুহম্মদ বখতিয়ার লক্ষণ সেনকে লক্ষণাবতী হইতে বিতাড়িত করিয়া বাংলায় সংস্কৃত চর্চার মূলে কুঠারাঘাত হানিয়া বাংলা চর্চার পথ উন্মুক্ত করেন।"
দেশি ভাষা যেহেতু কোন নির্দিষ্ট ভাষা ছিল না। ফলে মুসলমানরা আসার পরে সেই দেশি ভাষার সাথে প্রচুর পরিমাণে আরবি, ফার্সি ও উর্দু শব্দের মিশ্রণ ঘটে এক নতুন ভাষার সৃষ্টি হয় যা বর্তমানে বাংলা ভাষা নামে পরিচিত। অনেক ভাষাবিদ একে মুসলমানি বাংলা বলে অভিহিত করেছেন।
জেমস লং বলেছেন, "মুসলমানি বাংলা", হ্যালহেড বলেছেন, "দোভাষী বাংলা", আর সুকুমার সেন বলেছেন, "ইসলামী বাংলা।"
এই ভাষাতেই প্যারীচাঁদ মিত্র আলালের ঘরের দুলাল সাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন। যে বাংলা বঙ্কিমচন্দ্র মেনে নেয় নি।
দেখবেন মধ্যযুগে মুসলমান শাসনের সময় প্রচুর পরিমাণে পুঁথি সাহিত্য তৈরি হয়েছে, যেখানে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার সংমিশ্রণে এক বাংলা ভাষা পাওয়া যায়। এই মুসলমানি বাংলা মূলত মসনবী, দরবারি সাহিত্য, পুঁথি সাহিত্য এবং সুফি-সাধকদের রচনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। উদাহরণস্বরূপ, "নবী", "ফরমান", "দরবার", "বন্দেগী", "হালাল", "হারাম" ইত্যাদি শব্দ বাংলা ভাষায় সংযোজিত হয় এই সময় থেকেই।
এটাই ছিল মূল বাংলা ভাষা, যা মুসলিমদের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়।
কিন্তু ব্রিটিশরা আসার পরে এই মূল বাঙ্গলা ভাষার পরিবর্তন করে। সর্বপ্রথম ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মাধ্যমে মুসলমানি বাংলা ভাষাকে পরিবর্তন করে আর্যীকরন বা সংস্কৃতকরন করা হয়। খ্রিস্টান পাদ্রী হ্যালহেড, উইলিয়াম কেরী এবং হেনরী গিটস ফরস্টারের সাথে ব্রাহ্মণ পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামনাথ বিদ্যাবাচম্পতি, রামনাথ বসু একত্রে বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন করে। মূল বাংলা ভাষায় আরবি ফার্সি ও উর্দু শব্দকে বাদ দিয়ে সংস্কৃত যোগ করে প্রথম সাহিত্য রচনার গুরুভার হাতে নেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার সাহিত্য পড়লে দেখা যায় যে, সেখানে এক কৃত্রিম অবাস্তব ভাষা জোর করে ঢুকানো হয়েছে যা এর পূর্বে কোন বাঙ্গালি শোনেনি।
ভাষা তৈরি হয় যার যার অঞ্চলের পরিবেশ, ঐতিহ্য ও প্রথা নিয়ে। যা হতে সময় লাগে শত শত বছর। কিন্তু ব্রিটিশরা ব্রাহ্মণদের সাথে নিয়ে এই শত বছর ধরে তৈরি হওয়া মুসলমানি বাংলা ভাষাকে রাতারাতি পরিবর্তন করে সংস্কৃতকরন করে।
এভাবে তারা মূল বাংলাকে পরিবর্তন করে নতুন তত্ত্ব হাজির করে প্রচার করে, বাংলা ভাষা হচ্ছে সংস্কৃত ভাষার জননী বা কন্যা।
এই পন্ডিতি বা সংস্কৃত বাংলার বিষয়ে হিন্দুরাও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত করণ করার প্রসঙ্গে লেখেন,
"১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে হ্যালহেড এবং পরবর্তীকালে হেনরি গিটস ফরস্টার ও উইলিয়াম কেরী বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত জননীর সন্তান ধরিয়া আরবী-পারসীর অনধিকার প্রবেশের বিরুদ্ধে রীতিমতো ওকালতি করিয়াছেন এবং প্রকৃতপক্ষে এই তিন ইংলন্ডীয় পণ্ডিতের যত্ন ও চেষ্টায় অতি অল্প দিনের মধ্যে বাংলা ভাষা সংস্কৃত হইয়া উঠিয়াছে। ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে এই আরবী-পারসী নিসূদন যজ্ঞের সূত্রপাত এবং ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে আইনের সাহায্যে কোম্পানির সদর মফস্বল আদালতসমূহে আরবী-পারসীর পরিবর্তে বাংলা ও ইংরেজি প্রবর্তনে এই যজ্ঞের পূর্ণাহতি। বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মও এই বৎসর। এই যজ্ঞের ইতিহাস অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক, আরবী-পারসীকে অশুদ্ধ পদ ধরিয়া শুদ্ধ প্রচারের জন্য সেকালে কয়েকটি ব্যাকরণ অভিধানও রচিত হয় ও প্রচারিত হইয়াছিলো। সাহেবেরা সুবিধা পাইলেই আরবী-পারসীর বিরোধিতা করিয়া বাংলা ও সংস্কৃতকে প্রাধান্য দিতেন। ফলে দশ-পনেরো বৎসরের মধ্যেই বাংলা গদ্যের আকৃতি ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হইয়াছিলো।"
পন্ডিতি বা সংস্কৃত বাংলার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অগ্রগণ্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মীয় প্রমথ চৌধুরী।
বেদান্তের অনুবাদ প্রসঙ্গে রাজা রামমোহন রায় বলেছিলেন 'বাংলা সংস্কৃতির অধীন'। প্রমথ চৌধুরী এই অধীনতার বিরুদ্ধে রীতিমতো বিদ্রোহ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন অধীনতাটা অভিধানের, ব্যাকরণের নয়।
তিনি লিখেছিলেন, "অন্যান্য জীবের মতো ভাষার বিশেষত্ব তার গঠন আশ্রয় করে থাকে, কিন্তু তা তার দেহাকৃতির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ভাষার দেহের পরিচয় তার অভিধানে এবং গঠনের পরিচয় ব্যাকরণে। সুতরাং বাংলার এবং সংস্কৃতের আকৃতিগত মিল থাকলেও জাতিগত কোনো রূপ - মিল নেই। প্রথমটা হচ্ছে Analytic ভাষা, দ্বিতীয়টা হচ্ছে Inflectional ভাষা। সুতরাং বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতির অনুরূপ গড়ে তোলবার চেষ্টা করে আমরা বাংলা ভাষার জাতি নষ্ট করি। শুধু তাই নয়, তার প্রাণ বধ করার উপক্রম করি।"
বাংলা ভাষা সংস্কৃতির দুহিতা এই মতও প্রমথ চৌধুরী বাতিল করেছেন।
তিনি মনে করেন, "বাংলা ভাষা সংস্কৃতির দুহিতা, দৌহিত্রী কোনোটাই নয় বাংলা মাগধী প্রাকৃতের বংশধর।"
এর রেশ ধরেই তিনি বঙ্কিম-রবীন্দ্রের প্রণীত কৃত্রিম সাধু ভাষার বাইরে গিয়ে প্রথম চলিত ভাষার উদ্ভব ঘটান। সাধু ভাষা ছিল সংস্কৃতঘেঁষা যে ভাষায় কোন কালেই বাংলার মানুষ কথা বলে নি।
আর মুসলমানি আমলে পুঁথি সাহিত্যে ফারসি, আরবি ও দেশি শব্দের মিশ্রণ ছিল এবং এটি সাধারণ মানুষের ভাষায় লেখা হতো, যে ভাষায় বাংলার মানুষ কথা বলতো। গাজী-কালু-চম্পাবতী, জয়নবের পালা, আমির হামজা – এসব মুসলমানি পুঁথি সহজ, সরল ও কথ্য বাংলা ঘরানার ছিল।
ভাষা হচ্ছে একটি জাতির মূল সত্তা। ভাষার মাধ্যমেই সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।
এ প্রসঙ্গে নোয়াম চমাস্কি বলেছন,
"A language is not just words. It's a culture, a tradition, a unification of community, a whole history that creates what community is. It's all embodied in a language."
"একটি ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়। এটি একটি সংস্কৃতি, একটি ঐতিহ্য, একটি সম্প্রদায়ের ঐক্য, এবং এক সম্পূর্ণ ইতিহাস, যা সেই সম্প্রদায়কে গঠন করে। একটি ভাষার মধ্যেই সেই ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণরূপে প্রতিফলিত হয়।"
এতক্ষণ কথা বলছিলাম লেখক ফাহমিদ-উর-রহমান এর বই বঙ্গ বাঙ্গালা বাঙ্গালী
নিয়ে।
বইটিতে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন মুসলিম প্রণীত মূল বাংলা ভাষাকে কিভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ব্রিটিশদের সাহায্যে সংস্কৃতকরণ করেছে।
লেখক দেখিয়েছেন বাংলা ভাষার ভিতরে আরবি, ফারসি ও উর্দু থাকায় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বাংলা ভাষাকে মুসলমানি বাংলা, বটতলার পুঁথি সাহিত্য বলে বিদ্রুপ করলেও সেই মূল বাংলা ভাষাকে যখন সংস্কৃত শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয় তখন তাকে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা হিন্দুয়ানি বাংলা বলে না।
শেষ করব ১৯৩৭ সালে সিলেটে মুসলিম সাহিত্য সংসদের প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে মৌলবি দেওয়ান মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরীর বক্তব্য দিয়ে।
তিনি বলেন,
"আমাদের মুসলিম সমাজে মাতৃভাষা লইয়া কোনো বিরোধ নাই। এমন নির্বোধ কে আছে যে বাঙ্গালাকে মাতৃভাষা বলিবে না, কিন্তু আসল বিরোধই বাঙ্গালার কালচারের ভাষা লইয়া। বাঙ্গালা ভাষা নিশ্চয়ই আমাদের মাতৃভাষা, কিন্তু বর্তমানে স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তক ও কাব্য উপন্যাসের বিদ্যাসাগরী রাবীন্দ্রিক বাঙ্গালাকে আমরা কখনও নিজের মাতৃভাষা বলিয়া গ্রহণ করিতে পারি না। যে ভাষায় আল্লাহ, রসুল, নামায, রোজার নাম গন্ধ নাই, যে ভাষায় তৃষ্ণায় কণ্ঠাগত হইলেও পাঠক মুসলিমের প্রাণ স্পর্শ করিবে না সে ভাষা কখনো আমাদের মাতৃভাষা হইতে পারে না। ইহাকে আমাদের বিমাতৃভাষা বলা যাইতে পারে। আমি আধুনিক বিদ্যাসাগরের বাঙ্গালাকে আমাদের বিমাতৃভাষা বলিয়া থাকি। বিমাতা যেমন সৎ পুত্রের সহিত কর্কশ ব্যবহার করিয়া থাকেন, আমাদের ভাষা কর্তৃপক্ষও ঠিক সেইরূপ আরবী-ফারসী শব্দ ব্যবহার সম্বন্ধে কঠোর ব্যবহার করিয়া থাকেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙ্গালা পরীক্ষক বাবু রাজেন্দ্রচন্দ্র শাস্ত্রী মহাশয় 'কখনো বিশুদ্ধ বাংলা হইবে না' বলিয়া আরবী ফারসী শব্দ ব্যবহার করিতে নিষেধ করিয়াছেন। আরবী-ফারসী শব্দ ব্যবহারের অপরাধে প্রবাসী যদি ইহাকে মক্তবের ভাষা ও পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় 'মুসলিম বাংলা' বলিয়া বিদ্রূপ করিতে পারিলেন, তবে সংস্কৃত শব্দ ব্যবহৃত হয় বলিয়া আমরাও কেন টোলের বাংলা, হিন্দুয়ানী বাংলা, পণ্ডিতী বাংলা, ভট্টাচার্যের বাংলা, শূদ্রের বাংলা প্রভৃতি হরেক রঙ্গের বাঙ্গালা বলিতে পারিব না? আরবী-ফারসী শব্দকে রায় বাহাদুর ডা. দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় যদি 'যবনাধিকারের চিহ্ন' বলিতে পারিলেন, তবে সংস্কৃত শব্দকে 'কাফির অধিকারের চিহ্ন' বলিলে সেন মহাশয়ের কাছে কেমন লাগিবে? তারপর মধ্যপ্রদেশের ডাঃ মুঞ্জের ভাষার অনুকরণ করিয়া বাঙ্গলার কবি রবীন্দ্রনাথ মুসলিম বঙ্গকে ধমক দিয়া বলিলেন-'আজকের বাংলা ভাষা যদি বাঙ্গালী মুসলমানদের ভাব সুস্পষ্টরূপে ও সহজভাবে প্রকাশ করিতে অক্ষম হয় তবে তারা বাংলা ত্যাগ করিয়া উর্দু গ্রহণ করিতে পারেন।' এই কথায় ডা. রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত হিন্দু মানসিকতা বিশেষভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে। বিশ্ব প্রেমিক কবি রবীন্দ্রনাথ বিশ্বমানবতার বিমানে চড়িয়া যখন আকাশে ভ্রমণ করিতেন, তখন তিনি সকল দেশের সকল সমাজের, কিন্তু যখন তিনি এই সাম্প্রদায়িকতার ধুলাবালি পূর্ণ পৃথিবীতে আকাশ হইতে নামিয়া আসিলেন তখন তিনি আর বিশ্বপ্রেমিক রহিলেন না; হইয়া গেলেন হিন্দু প্রেমিক ও হিন্দু কবি। তিনি বোধ হয়- এখনো উনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু যুগে ডুবিয়া আছেন। আমরা তাহাকে জানাইয়া বলিতেছি, আজ বাঙ্গালাদেশ ও বাঙ্গলা সাহিত্য মুসলিমের। বাঙ্গালা ও বাঙ্গালী বলতে তুর্কী ও আফগানের ন্যায় মুসলিমকেই বুঝাইয়া থাকে। তিনি যদি মুসলিমের আরবী-ফারসী শব্দের প্রচলন বরদাস্ত করিতে না পারেন তবে নিজেই বাংলা সাহিত্য ত্যাগ করিয়া বিশ্বভারতী আশ্রমে আশ্রয় গ্রহণ করিতে পারেন।"
বইঃ বঙ্গ বাঙ্গালা বাঙ্গালী
লেখকঃ ফাহমিদ-উর-রহমান
প্রকাশনীঃ মক্তব প্রকাশন
দ্বিতীয় সংস্করণঃ অক্টোবর, ২০২৩
গ্রন্থ পর্যালোচনা: ইউসুফ ইমাম
বাদ আছর, ৫ টা ৯
১৬ ই রমজান, ১৪৪৬ হিজরি।
মিরপুর