02/06/2026
#নির্বাসিত_ভালোবাসা
#লেখনীতে_ফাহমিনা_আফরোজ_প্রমি
#পর্ব_২১
সোমবার সকাল।
আজ সন্ধ্যায় শুপ্তর জন্মদিন। সকাল থেকেই সাফা আর মারওয়া যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে আছে। দুই বোনের আজ আর কোনো কিছুতেই মন বসছে না। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই তারা শুধু জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলছে।
— “আম্মু, আমি গোলাপি ফ্রকটা পরব।”
সাফা কথাটা বলতেই মারওয়া সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল।
— “না! আমরা দুইজন একই রঙের জামা পরব।”
— “মৌসুমী আন্টি বলছে ম্যাচিং ড্রেস পরলে ছবি সুন্দর আসে।”
নীরা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে নাস্তা তৈরি করছিল। মেয়েদের কথা শুনে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সকালের নরম রোদ জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকছে। আর সেই আলোয় দুই বোনের উচ্ছ্বসিত মুখগুলো আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। সাফা হঠাৎ দৌড়ে এসে নীরার পাশে দাঁড়াল।
— “আম্মু, আমার চুলে আজ কার্ল করে দিবা?”
নীরা হেসে বলল,
— “কার্ল করতে গেলে অনেক সময় লাগবে মা।”
— “তাহলে দুই পাশে সুন্দর করে বেণী করে দিবা?”
মারওয়া দ্রুত বলল,
— “আমার খোঁপা লাগবে।”
— “বড় মেয়েদের মতো।”
নীরা এবার হেসে ফেলল।
— “তুমি আবার বড় মেয়ে হলে কবে?”
মারওয়া গম্ভীর মুখ করে বলল,
— “আমি অনেক বড়।”
এই কথা শুনে সাফা হেসে গড়িয়ে পড়ল। দুই বোন আবার নিজেদের মধ্যে তর্ক শুরু করে দিল কে বেশি সুন্দর লাগবে, কার চুল বেশি লম্বা, কার ফিতা বেশি সুন্দর। ঘরজুড়ে তাদের হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
নীরা কিছুক্ষণ চুপচাপ মেয়েদের দিকে তাকিয়ে রইল। এই কয়েকদিনের ঝড়ঝাপটার পর আজ অনেকদিন পর তার ঘরে এমন প্রাণখোলা হাসি ফিরেছে।
কোর্টের চিন্তা...
মেহরিনের ঘটনা...
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা...
সবকিছু যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য দূরে সরে গেল। সে মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল। জীবনে যত কষ্টই আসুক, এই দুইটা ছোট মানুষ এখনও তার হাসির কারণ হয়ে আছে। ঠিক তখনই সাফা আবার এসে জড়িয়ে ধরল নীরাকে।
— “আম্মু, আজকে কিন্তু আমরা দেরি করব না।”
— “আগে আগে যাব।”
নীরা অবাক হয়ে বলল,
— “এত তাড়া কেন?”
সাফা মুখ উজ্জ্বল করে বলল,
— “শুপ্তর কেক কাটার আগে যেতে হবে।”
মারওয়া উত্তেজিত গলায় যোগ করল,
— “আর আমরা বেলুনও ফোলাব।”
— “শুপ্তকে হেল্প করব।”
নীরা মেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
— “আচ্ছা, আগে নাস্তা করো। তারপর বিকেলে তোমাদের দুই রাজকন্যাকে এমন সুন্দর করে সাজাব যে সবাই তাকিয়ে থাকবে।”
এই কথা শুনে দুই বোন খুশিতে চিৎকার করে উঠল।
আর নীরা তাদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল—
জীবন যতই কঠিন হোক... এই হাসিগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্যই তাকে লড়াই করে যেতে হবে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই পুরো বাসায় ছোটখাটো উৎসবের আমেজ তৈরি হয়ে গেল। সাফা আর মারওয়া দুপুর থেকেই প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর এসে নীরাকে একই প্রশ্ন করছে—
— “আম্মু, এখন কি সন্ধ্যা হয়েছে?”
— “আমরা এখন বের হব?”
— “শুপ্ত কি কেক কেটে ফেলছে?”
শেষ পর্যন্ত নীরা বিরক্ত হওয়ার বদলে হেসেই ফেলল।
— “আল্লাহ! তোমরা দুইজন তো মনে হচ্ছে নিজের জন্মদিনে যাচ্ছ।”
সাফা গম্ভীর মুখে বলল,
— “শুপ্ত আমাদের বন্ধু।”
মারওয়া সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
— “বেস্ট ফ্রেন্ড।”
দুই বোনের কথা শুনে নীরা মাথা নেড়ে হাসল। এদিকে নীরার মা নিজের ঘরে বসে শাড়ি ঠিক করছিলেন। যেহেতু এখন থেকে তিনি নীরার সাথেই থাকবেন, তাই আজকে অনেকদিন পর একটু সাজগোজও করেছেন।
মৌসুমী কয়েকদিন আগেই বলে দিয়েছিল—
— “খালাম্মাকেও নিয়ে আসবি।”
প্রথমে নীরার মা অনেক না-না করেছিলেন।
— “আমি গিয়ে কি করব?”
— “তোমরা যাও।”
কিন্তু নীরা ছাড়ার পাত্রী ছিল না। শেষ পর্যন্ত মেয়ের জোরাজুরিতে রাজি হয়েই গেলেন। সন্ধ্যার একটু আগে সবাই প্রস্তুত হয়ে গেল। সাফা আর মারওয়া আজ একদম রাজকন্যার মতো সেজেছে। দুইজনের পরনেই সুন্দর আকাশি-নীল রঙের পার্টি ফ্রক। ফ্রকের নিচের অংশে ছোট ছোট রূপালি কাজ করা। চুল দুটো সুন্দর করে কার্ল করা হয়েছে। মাথায় ছোট্ট নীল রঙের হেয়ার ব্যান্ড। নিজেদের আয়নায় দেখে দেখে তারা নিজেরাই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সাফা আয়নার সামনে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
— “মারওয়া, আমাকে কেমন লাগছে?”
মারওয়া কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— “ভালো।”
তারপর নিজের জামার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কিন্তু আমি বেশি সুন্দর।”
এই কথা শুনেই দুই বোনের আবার শুরু হয়ে গেল। নীরা তাদের কাণ্ড দেখে হাসতে হাসতে নিজের প্রস্তুতি শেষ করছিল। আজ অনেকদিন পর সেও একটু মন দিয়ে সাজল। গাঢ় নেভি ব্লু রঙের শাড়িটা বের করল। শাড়ির ওপর সূক্ষ্ম রূপালি কাজ করা। তার সাথে ডায়মন্ড কাট করা গলার হার আর কানের দুল। হাতে মিলিয়ে চুড়ি।
চুলে হালকা কার্ল করা হয়েছে। আর শেষ মুহূর্তে জমুনা ফিউচার পার্ক থেকে কেনা সেই পারফিউমটা ব্যবহার করল। মিষ্টি, নরম সুবাস মুহূর্তেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নীরা কয়েক সেকেন্ড নিজেকে দেখল। অনেকদিন পর নিজেকে মানুষ বলে মনে হচ্ছে।
শুধু মা নয়... শুধু সংগ্রাম করা একজন নারী নয়... আজ যেন আবার একটু নিজের জন্যও বেঁচে আছে। তার মা বের হয়ে এসে মেয়ের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর মুগ্ধ গলায় বললেন,
— “মাশাআল্লাহ।”
— “তোরে অনেক সুন্দর লাগতেছে মা।”
নীরা হালকা হেসে বলল,
— “তোমাকেও তো কম সুন্দর লাগতেছে না।”
নীরার মাও আজ নীল রঙের জামদানি শাড়ি পরেছেন।
মাথায় সুন্দর করে ঘোমটা টানা। মুখে শান্ত একটা মায়াবী হাসি। ঠিক তখনই নিচে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। মৌসুমী আগেই তাদের জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। সাফা আর মারওয়া যেন আর অপেক্ষাই করতে পারছিল না।
— “গাড়ি আসছে!”
— “গাড়ি আসছে!”
চিৎকার করতে করতে তারা দরজার দিকে দৌড় দিল।
কিছুক্ষণ পর সবাই নিচে নেমে এল। গাড়িতে উঠার পরও দুই বোনের উত্তেজনা কমল না। একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে। একবার শুপ্তর জন্য কী উপহার নিয়েছে সেটা দেখছে। আবার কখনো নীরাকে জিজ্ঞেস করছে—
— “আম্মু, আমরা কি আগে পৌঁছাব?”
— “আবরার আঙ্কেল আসবে?”
এই প্রশ্ন শুনে নীরা এক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল,
— “জানি না মা।”
সাফা মুখ ফুলিয়ে বলল,
— “আসলে ভালো হয়।”
মারওয়া দ্রুত মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ।”
— “আবরার আঙ্কেল ভালো।”
নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। ঢাকার সন্ধ্যার ব্যস্ত রাস্তা ধীরে ধীরে আলোয় ভরে উঠছে। গাড়ির কাঁচে শহরের রঙিন আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। আর গাড়ির ভেতরে বসে সাফা আর মারওয়ার খুশির শব্দে পরিবেশটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। আজকের সন্ধ্যাটা অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও কোর্ট, মামলা, কষ্ট আর দুশ্চিন্তা থেকে দূরে থাকবে। এমনটাই আশা করছিল নীরা। কিন্তু সে জানত না— এই জন্মদিনের অনুষ্ঠানেই এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে, যা অনেক দিনের জমে থাকা অনুভূতিগুলোকে আবার নতুন করে নাড়া দিয়ে যাবে।
নীরারা সময়মতো পার্টি সেন্টারে পৌঁছে গেল। দূর থেকেই জায়গাটার ঝলমলে সাজসজ্জা চোখে পড়ছিল। পুরো পার্টি সেন্টারটা আজ নীল রঙের থিমে সাজানো চারপাশে অসংখ্য নীল, সাদা আর রূপালি বেলুন। ছাদ থেকে ঝুলছে ঝকঝকে ফিতা আর আলো। প্রবেশপথের দুই পাশে বেলুন দিয়ে বড় বড় খিলান বানানো হয়েছে। ভেতরে ঢুকতেই মনে হচ্ছিল যেন কোনো রূপকথার রাজ্যে চলে এসেছে সবাই। সাফা আর মারওয়া ভেতরে ঢুকেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে রইল না। দুজনেই খুশিতে চিৎকার করতে করতে শুপ্তর দিকে দৌড়ে চলে গেল।
— “শুপ্ত!”
— “আমরা আসছি!”
শুপ্তও বন্ধুদের দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই তিনজন নিজেদের জগতে হারিয়ে গেল। নীরাদের ঢুকতে দেখে ইরফান ভাই এগিয়ে এলেন। মুখে সবসময়কার মতো ভদ্র হাসি। প্রথমেই তিনি নীরার মায়ের দিকে তাকিয়ে সালাম দিলেন।
— “আসসালামু আলাইকুম খালাম্মা।”
নীরার মা হাসিমুখে সালামের উত্তর দিলেন।
— “ওয়ালাইকুম আসসালাম বাবা। কেমন আছো?”
— “আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
— “আমিও ভালো আছি বাবা।”
কিছুক্ষণ কুশল বিনিময়ের পর নীরা তার মাকে হলরুমের এক পাশে রাখা চেয়ারগুলোর দিকে নিয়ে গেল। সেখানে ইরফান ভাইয়ের মা আগে থেকেই বসে ছিলেন। দুজনের বয়স কাছাকাছি হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই গল্প জমে গেল।
নীরা হেসে বলল,
— “মা, তুমি এখানে বসো। তোমাদের আড্ডা শুরু করো।”
নীরার মা মুচকি হেসে বসে পড়লেন। একপাশে মুরুব্বিরা নিজেদের গল্পে মেতে উঠলেন। সংসার, সন্তান, নাতি-নাতনি—কত বিষয় নিয়েই না তাদের কথা। নীরা তখন হাতে থাকা শুপ্তর জন্মদিনের উপহারটা নিয়ে হলরুমের এক কোণে সাজানো উপহারের টেবিলের দিকে গেল। টেবিলটা ইতোমধ্যে নানা রঙের মোড়কে সাজানো উপহারে ভরে উঠতে শুরু করেছে। নীরা নিজের উপহারটাও সুন্দর করে সেখানে রেখে দিল। তারপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে মৌসুমীকে খুঁজতে লাগল। মৌসুমী আজ নীল রঙের শাড়ি পরে ব্যস্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনো অতিথিদের সঙ্গে কথা বলছে, কখনো কর্মচারীদের কিছু নির্দেশ দিচ্ছে, আবার কখনো শুপ্তর দিকে নজর রাখছে। নীরা ধীরে ধীরে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর মৃদু স্বরে ডাক দিল,
— “মৌসুমী...”
মৌসুমী কথা বলতে বলতে পিছনে ফিরল। আর নীরাকে দেখেই সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একেবারে থমকে গেল।
তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত নীরাকে একবার ভালো করে দেখে সে দুহাত দিয়ে নিজের গাল চেপে ধরে বলে উঠল,
— “ও মা!”
আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দু-একজন অতিথিও তার চমকে ওঠা দেখে তাকিয়ে রইল। মৌসুমী এবার নীরার দুই কাঁধ ধরে বলল,
— “আমার নীরাকে তো একদম নতুন বউ লাগছে!”
নীরা হালকা হেসে ফেলল। মৌসুমী থামার মেয়ে না।
সে আবার বলল,
— “সত্যি বলছি, তোকে আজকে যা সুন্দর লাগছে!
আরো দশটা বিয়ে দেওয়া যাবে তোকে!”
নীরা এবার মাথা নেড়ে হাসল।
— “তোর বাজে কথা আর গেল না তাই না?”
মৌসুমী ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “আমি এত সুন্দর একটা কথা বললাম, আর তোর কাছে সেটা বাজে কথা?”
— “আহারে, সুন্দর মানুষদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তারা নিজের সৌন্দর্য নিজেরাই বুঝে না।”
নীরা এবার চোখ রাঙিয়ে বলল,
— “চুপ কর। মানুষজন শুনতেছে।”
মৌসুমী একটুও না দমে আরও কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
— “মানুষজনও যদি দেখে তাহলে আমার কথাই বলবে।”
নীরা হেসে মাথা নিচু করল। মৌসুমী তখনও নীরার শাড়ি, গয়না আর কার্ল করা চুল দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
নীরা চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। মৌসুমী হাসতে হাসতে বলল,
— “কেমন?”
— “আমার ছেলের জন্মদিন বলে কথা।”
নীরা মাথা নেড়ে বলল,
— “অনেক সুন্দর হয়েছে।”
ঠিক তখনই ইরফান ভাই মাইক্রোফোন হাতে কিছু কর্মচারীর সাথে কথা বলতে বলতে পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন।
নীরাদের দেখে তিনি মুচকি হেসে বললেন,
— “আপনার বান্ধবীকে সামলান।”
— “গত এক মাস ধরে বাসার সবাইকে পাগল বানাইছে এই জন্মদিন নিয়ে।”
মৌসুমী সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল।
— “আপনি চুপ করেন।”
— “আপনার ছেলের জন্মদিন নাকি আমার একার?”
ইরফান ভাই শুধু মাথা নেড়ে হাসলেন। তাদের খুনসুটি দেখে আশেপাশের কয়েকজনও হেসে ফেলল। নীরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। অনেকদিন পর এত মানুষ, এত আলো, এত আনন্দের মধ্যে এসেছে। হঠাৎ তার মনে হলো... জীবনটা কি সত্যিই ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে? ঠিক তখনই পার্টি সেন্টারের প্রধান দরজার দিকে হালকা একটা নড়াচড়া হলো। কিছু অতিথি সরে দাঁড়াল। মৌসুমী দরজার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মুখে দুষ্টু হাসি আনল।
— “ওহ...”
নীরা অবাক হয়ে বলল,
— “কি হলো?”
মৌসুমী ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে বলল,
— “কিছু না।”
কিন্তু তার চোখ দরজার দিকেই স্থির। নীরা কৌতূহলী হয়ে পিছনে তাকাতেই দেখল— পার্টি সেন্টারের প্রবেশদ্বার দিয়ে একজন লম্বা মানুষ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকছে। নেভি ব্লু ব্লেজার। সাদা শার্ট। পরিপাটি চুল। হাতে মোড়ানো একটা গিফট বক্স। আবরার।
পার্টি সেন্টারের প্রধান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল আবরার। হাতে শুপ্তর জন্য আনা উপহারের ব্যাগ। ভেতরে ঢুকেই সে একবার চারপাশে চোখ বুলাল।চারদিকে নীল আর রূপালি রঙের ঝলমলে সাজসজ্জা। বাচ্চাদের হাসির শব্দ, অতিথিদের কথাবার্তা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু এসবের কিছুই যেন তার চোখে ধরা পড়ল না। কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে তার দৃষ্টি গিয়ে থামল একজনের উপর। নীরা।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য আবরার যেন স্থির হয়ে গেল।
তার চোখ আর সরল না। নেভি ব্লু শাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে নীরা। হালকা কার্ল করা চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। কানের দুলগুলো আলোয় চিকচিক করছে। হাতে মিলিয়ে চুড়ি। মুখে খুব হালকা সাজ, অথচ সেই সামান্য সাজেই তাকে অসাধারণ লাগছে। আবরারের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন ধক করে উঠল। কত বছর হয়ে গেছে? আট বছর? নয় বছর? সে নিজেও ঠিক মনে করতে পারল না। কত বছর হলো নীরাকে এভাবে সাজতে দেখেনি। একসময় ঈদের দিন, বিয়ের অনুষ্ঠানে, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিশেষ আয়োজনে নীরা যখন শাড়ি পরত, আবরার লুকিয়ে লুকিয়ে তাকিয়ে থাকত। আজ এত বছর পর আবার সেই অনুভূতিটা ফিরে এলো। বরং আগের চেয়েও তীব্র হয়ে। নীল শাড়িতে নীরাকে সত্যিই পরীর মতো লাগছে। আবরারের গলা শুকিয়ে এলো। সে অনুভব করল তার হৃদস্পন্দন ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে।
ধুক...
ধুক...
ধুক...
অস্বাভাবিক দ্রুত। সে অজান্তেই নিজের ডান হাতটা তুলে বুকের বাঁ পাশে রাখল। যেন নিজের হৃদয়টাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। বরং যতবার নীরার দিকে তাকাচ্ছে, ততবার বুকের ভেতরের অস্থিরতা বাড়ছে। আবরার ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিল।
নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল।
"শান্ত হও।"
"ও শুধু তোমার ক্লায়েন্ট।"
"শুধু একজন ক্লায়েন্ট।"
কিন্তু তার নিজের মনই যেন সেই কথাগুলো বিশ্বাস করতে চাইছিল না। আবরার কয়েক মুহূর্ত একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে মানুষজন কথা বলছে। বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে। হাসির শব্দ, মাইক্রোফোনে কারও কথা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ—সবকিছুই চলছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার কাছে যেন কোনো শব্দই পৌঁছাচ্ছে না।
তার দৃষ্টি শুধু এক জায়গাতেই আটকে আছে। নীরা।
মনে হচ্ছিল ধীরে ধীরে চারপাশের সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মানুষগুলো অস্পষ্ট। আলো অস্পষ্ট। শব্দগুলোও দূরের কোনো প্রতিধ্বনির মতো। যেন পুরো হলরুমটা মিলিয়ে গেছে। শুধু একজন মানুষ স্পষ্ট। নীরা। নীল শাড়ির আঁচলটা হালকা বাতাসে দুলছে। হাসতে হাসতে মৌসুমীর কিছু একটা কথার জবাব দিচ্ছে সে। আবরারের মনে হলো সময় যেন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছে। হঠাৎই বহু বছর আগের অসংখ্য স্মৃতি একসাথে ভিড় করে এলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর। বৃষ্টিভেজা বিকেল। রিকশার হুডের নিচে বসে থাকা নীরা। পরীক্ষার পর ফুচকা খাওয়া। অকারণে ঝগড়া। অভিমান। হাসি।
আর সেই মেয়েটা... যাকে একসময় সে ভেবেছিল কোনোদিন হারাবে না। আবরারের বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত শূন্যতা আর উষ্ণতা একসাথে খেলা করতে লাগল।
তার মনে হচ্ছিল চারপাশের সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। আর সে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতি আর বর্তমানের মাঝখানে। এক মুহূর্তের জন্য সে ভুলেই গেল সে কোথায় আছে। কেন এসেছে। কার জন্মদিন। সবকিছু। শুধু নীরাকে দেখেই যাচ্ছে। আর ঠিক তখনই তার মনের ভেতর অজান্তেই একটা সুর বেজে উঠল—
তেরি নাজরোঁ কা দিল পে হুয়া হ্যায় আসার
তু মেরা মেহবুব হ্যায় জানা
তেরি উলফাত মেঁ জিতা হার পাল
তু ইক তোহফা হ্যায় খুদা কা
তুঝে পা কে জাবাব মিলা হ্যায় আসাল
তু হ্যায় ওহ সাওয়াল খুদা কা
তু মিলা হ্যায় ইয়ে মেরি দুয়া কা আসার
তু মুঝসে দূর না জানা
তেরি নাজরোঁ কা দিল পে হুয়া হ্যায় আসার
তু মেরা মেহবুব হ্যায় জানা
তেরি উলফাত মেঁ জিতা হার পাল
তু ইক তোহফা হ্যায় খুদা কা
সে নিজেই বুঝতে পারল না কেন এমন হচ্ছে। বহু বছর ধরে সে নিজের অনুভূতিগুলোকে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে। কিন্তু আজ... আজ যেন সেই বাঁধের কোথাও ছোট্ট একটা ফাটল ধরেছে। আবরার অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে বাস্তবে ফেরার চেষ্টা করল।
"এভাবে তাকিয়ে থাকা ঠিক না।"
নিজেকে কঠিন গলায় বলল সে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই আবার তার চোখ চলে গেল নীরার দিকে। আর তখনই সে দেখল— নীরা হেসে মাথা নিচু করেছে। সেই পরিচিত হাসি। যে হাসি একসময় তার পুরো দিন সুন্দর করে দিত।
আবরারের বুকের ভেতর আবারও ধক করে উঠল। সে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল। কারণ সে যতই অস্বীকার করুক... এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় শত্রু আর কেউ না— তার নিজের মন।
আবরার শেষ পর্যন্ত আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।
নিজেকে যতই অন্যদিকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করুক, চোখ বারবার নীরার দিকেই চলে যাচ্ছিল। অবশেষে সে ধীরে ধীরে নীরা আর মৌসুমীর দিকে এগিয়ে গেল। আবরারকে আসতে দেখে মৌসুমী মুচকি হাসল। আর নীরা... সে এক মুহূর্তের জন্য আবরারের দিকে তাকিয়েই আবার চোখ নামিয়ে নিল। আবরার তাদের সামনে এসে দাঁড়াল।কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে নরম গলায় বলল,
— “কেমন আছো?”
প্রশ্নটা নীরার উদ্দেশ্যে। নীরা মাথা তুলে একবার তার দিকে তাকাল।তারপর খুব সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নেড়ে বলল,— “ভালো।”
আবার চোখ নামিয়ে নিল। আবরার বুঝতে পারল নীরা এখনো তার সামনে খুব সহজ হতে পারে না। হয়তো কোর্ট, মামলা আর এতকিছুর ভিড়ে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। ঠিক তখনই মৌসুমী কথার মাঝে ঢুকে পড়ল। হাসিমুখে বলল,
— “তাইলে চলেই আসলেন লইয়ার সাহেব!”
আবরার হেসে ফেলল।
— “আসবো না কীভাবে?”
— “যেভাবে বিপজ্জনকভাবে ইনভাইট করেছিলেন, না এসে উপায় ছিল?”
মৌসুমী ভান করে ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “আমি আবার কী করলাম?”
— “আমি তো ভদ্রভাবে দাওয়াত দিয়েছিলাম।”
আবরার মাথা নেড়ে বলল,
— “ভদ্রভাবে?”
— “গিফট আনতেই হবে, না আসলে চলবে না, সময়মতো উপস্থিত থাকতে হবে—এসবকে আপনি ভদ্রভাবে বলা বলেন?”
মৌসুমী এবার হো হো করে হেসে উঠল।
— “আচ্ছা ঠিক আছে, একটু জোরাজুরি করেছিলাম।"
নীরাও না চাইলেও হালকা হেসে ফেলল। অনেকদিন পর তার মুখে এমন স্বাভাবিক হাসি দেখে আবরারের বুকের ভেতর কেমন যেন হলো। তবে সে কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। মৌসুমী দুজনের দিকে একবার তাকাল। তারপর মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। হঠাৎ বলল,
— “আচ্ছা, তোরা গল্প কর।”
— “আমি একটু গেস্টদের দেখে আসি।”
নীরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “এই শুন...”
কিন্তু মৌসুমী শুনলই না। দ্রুত সরে গেল অন্যদিকে।
নীরা অসহায়ভাবে তার চলে যাওয়া দেখল। তারপর চারপাশে তাকিয়ে অস্বস্তি লুকানোর চেষ্টা করল। হঠাৎ দুজনের মাঝখানে একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো।
আবরার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— “একটা কথা বলব?”
নীরা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “জি?”
আবরার এক মুহূর্ত ইতস্তত করল। তারপর নিচু গলায় বলল,
— “তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে, নীরা।”
কথাটা বলেই সে নীরার মুখের দিকে তাকাল। নীরা যেন পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে গাল দুটো হালকা লাল হয়ে উঠল।
সে বুঝতেই পারছিল না কী উত্তর দেওয়া উচিত।
ধন্যবাদ বলবে? নাকি অন্য কিছু? অস্বস্তিতে তার আঙুলগুলো শাড়ির আঁচল মুচড়ে ধরল।
— “আমি...”
কথা শুরু করেও থেমে গেল। ঠিক তখনই—
— “আবরার আঙ্কেল!”
— “আঙ্কেল!”
দুই দিক থেকে দুইটা ছোট্ট ঝড় এসে আবরারের পেছনে ধাক্কা দিল। সাফা আর মারওয়া দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। আবরার হেসে নিচু হয়ে দুজনকেই বুকের মধ্যে টেনে নিল।
— “আরে আমার প্রিন্সেসরা!”
সাফা উত্তেজিত গলায় বলল,
— “আঙ্কেল, ওইদিকে চলেন!”
মারওয়াও সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “হ্যাঁ, অনেক মজা হচ্ছে!”
— “অনেক অনেক!”
আবরার হেসে বলল,
— “আচ্ছা? কী হচ্ছে?”
সাফা তার হাত টানতে টানতে বলল,
— “চলেন না!”
— “গেলে দেখতে পারবেন!”
মারওয়া অন্য হাত ধরে টান দিল।
— “চলেন আঙ্কেল!”
আবরার একবার নীরার দিকে তাকাল। নীরা তখনও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল। তারপর আবরার মুচকি হেসে বলল,
— “আচ্ছা, চললাম তাহলে।”
সাফা আর মারওয়া যেন যুদ্ধ জিতে গেছে এমন আনন্দে চিৎকার করে উঠল। পরের মুহূর্তেই দুইজন দুই পাশ থেকে আবরারের হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। আর আবরারও তাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে প্লে জোনের দিকে চলে গেল। দূরে দাঁড়িয়ে নীরা সেই দৃশ্যটা দেখছিল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো— তার বুকের ভেতর হঠাৎ করে একটুখানি উষ্ণ অনুভূতি জন্ম নিল। সাফা আর মারওয়ার হাসির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল... যেন সে তাদের খুব আপন কেউ।
নীরার মা দূর থেকে অনেকক্ষণ ধরে সবকিছু লক্ষ্য করছিলেন। সাফা আর মারওয়া যেভাবে আবরারের হাত ধরে টানাটানি করছে, যেভাবে নিজেদের ছোট ছোট গল্প শোনাচ্ছে, আর আবরারও ধৈর্য নিয়ে সেগুলো শুনছে—দৃশ্যটা তার চোখ এড়াল না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আবরারকে একবারও বিরক্ত লাগছে না। বরং সে নিজেও বাচ্চা দুটোর সঙ্গে মিশে গেছে। একসময় সাফা কিছু একটা বলতেই আবরার হেসে উঠল। মারওয়াও সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে কিছু বোঝাতে লাগল। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, তাদের পরিচয় যেন আজকের না। অনেক দিনের। অনেক আপন। নীরার মায়ের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা দীর্ঘশ্বাস জমল। তিনি ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আস্তে আস্তে প্লে জোনের দিকে হাঁটতে লাগলেন। সেই সময় আবরার পুরোপুরি সাফা আর মারওয়ার সঙ্গে খেলায় ব্যস্ত।
হঠাৎ পিছন থেকে একটা মমতাভরা ডাক ভেসে এলো।
— “বাবা...”
আবরার পিছনে ফিরে তাকাল। নীরার মাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
— “আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।”
— “ওয়ালাইকুমআসসালাম বাবা।”
আবরার ভদ্রভাবে হাসল।
— “আপনি ভালো আছেন?”
— “আলহামদুলিল্লাহ বাবা, ভালো আছি।”
কিছুক্ষণ স্বাভাবিক কুশল বিনিময় হলো। সাফা আর মারওয়া আবার খেলায় মেতে উঠেছে। নীরার মা তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— “তুমি খুব সুন্দর করে বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে পারো বাবা।”
আবরার হালকা হেসে মাথা নেড়ে বলল,
— “ওরাই আসলে খুব মিষ্টি।”
— “তাই সহজেই আপন করে নেয়।”
নীরার মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
— “শুধু ওরা না বাবা...”
— “তুমিও মানুষকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারো।”
আবরার কিছু বলল না। শুধু ভদ্রতার হাসিটুকু ধরে রাখল। কিন্তু পরের কথাটা শুনে তার সেই হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। নীরার মা ধীরে ধীরে বললেন,
— “আমি আমার মেয়ের জন্য তোমার মতো একজন মানুষই চাই।”
আবরার যেন এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময় ফুটে উঠল। সে কয়েক সেকেন্ড কিছুই বলতে পারল না।বশুধু অবাক হয়ে নীরার মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।চারপাশের শব্দগুলোও যেন দূরে সরে গেল। নীরার মা ধীরে ধীরে আবরারের হাতের উপর হাত রাখলেন।তার চোখে একজন মায়ের অসহায়তা। একজন মায়ের স্বপ্ন।
তিনি নিচু গলায় বললেন,
— “এটা কি কোনোদিন সম্ভব হবে বাবা?”
আবরারের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে দ্রুত চারপাশে তাকাল। নীরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে কয়েকজন অতিথির সঙ্গে কথা বলছে। সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।
আবরার নিজের ভেতরের অস্থিরতাটা লুকিয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করল। তারপর ধীরে বলল,
— “আপনি কী বলছেন আন্টি?”
আবরারের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।কয়েক সেকেন্ড সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
— “আন্টি... একটা কথা বলব?”
নীরার মা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন।
— “বলো বাবা।”
আবরার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
— “যদি আপনি আর আঙ্কেল মিলে নয় বছর আগে নীরা আর আমার সঙ্গে এমন না করতেন... তাহলে হয়তো আজ নীরাকে এসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হতো না।”
নীরার মায়ের মুখের রঙ মুহূর্তেই বদলে গেল। আবরার তিক্ত হাসল।
— “তখন আমি আপনাদের কাছে একটা বেকার ছেলে ছিলাম।”
— “যার পকেট খালি ছিল।”
— “যার ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারত না।"
সে কয়েক সেকেন্ড থামল। তারপর বলল,
— “আর সাজ্জাদ ছিল প্রতিষ্ঠিত।”
— “টাকা ছিল, গাড়ি ছিল, ফ্ল্যাট ছিল।”
— “আপনারা শুধু টাকাটাই দেখেছিলেন, আন্টি।”
— “মানুষটাকে দেখেননি।”
নীরার মা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন। আবরারের গলায় এবার জমে থাকা বহু বছরের কষ্ট স্পষ্ট হয়ে উঠল।
— “আমি কি কম চেষ্টা করেছিলাম?”
— “আমি কি নীরাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য কম লড়েছিলাম?”
— “আমি বারবার গিয়েছি।”
— “বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি।”
— “শুধু একটু সময় চেয়েছিলাম।”
— “নিজেকে দাঁড় করানোর সুযোগ চেয়েছিলাম।”
তার চোখে হালকা লালচে আভা ফুটে উঠল।
— “কিন্তু আপনারা আমাকে সেই সুযোগটাও দেননি।”
চারপাশে তখনও পার্টির হাসি-আনন্দ চলছে। কিন্তু তাদের দুজনের চারপাশে যেন অন্য এক নীরবতা তৈরি হয়েছে। আবরার নিচু গলায় বলল,
— “আর আন্টি...”
— “আপনি কি ভুলে গেছেন আমার দুর্ঘটনার পর কী হয়েছিল?”
নীরার মা কেঁপে উঠলেন। আবরার এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।
— “আমি হাসপাতালে মাস খানেক ছিলাম।”
— “তারপর যখন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলাম...”
— “নীরার বাবা আমার সঙ্গে আর আমার পরিবারের সঙ্গে কী করেছিলেন, সেটা কি আপনার মনে নেই?”
নীরার মা ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেললেন। আবরার তিক্ত হাসল।
— “নাকি মনে আছে, কিন্তু না জানার ভান করছেন?”
কথাটা শুনে নীরার মায়ের চোখে পানি চলে এলো। তিনি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। আবরার আবার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নীরার দিকে তাকাল। নীরা তখনও কিছুই জানে না। মৌসুমীর সঙ্গে কথা বলছে। হালকা হাসছে।
আবরার ধীরে বলল,
— “হয়তো নীরা আজও সব জানে না।”
— “হয়তো তার বাবার করা কাজগুলোর পুরো সত্যটা কখনো তাকে বলা হয়নি।”
— “তাই তো সে এখনো আমাকে দোষী ভাবে।”
— “আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখে।”
তার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল।
— “কিন্তু বিশ্বাস করেন আন্টি...”
— “আমি কোনোদিন নীরাকে ছেড়ে যেতে চাইনি।”
— “কোনোদিন না।”
নীরার মা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
— “আমরা ভুল করেছি বাবা...”
— “অনেক বড় ভুল করেছি...”
আবরার কিছু বলল না। শুধু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নীরার দিকে তাকিয়ে রইল। আর তার বুকের ভেতর নয় বছরের পুরোনো ক্ষতটা আবার নতুন করে জ্বলে উঠল।
আবরার এবার গম্ভীর মুখে নীরার মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখে জমে থাকা কষ্ট আর অভিমান স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
— “আন্টি, আমি আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না।”
নীরার মা কিছু বলতে যাবেন, তার আগেই আবরার আবার বলে উঠল—
— “নীরার বাবা আমার আর আমার পরিবারের সঙ্গে যা করেছিলেন, সেই কাহিনি আমাদের পুরো পরিবারকে ভেঙে দিয়েছিল।”
কথাগুলো বলতে বলতে আবরারের গলার স্বর ভারী হয়ে উঠল।
— “আমাদের এই শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। নিজের বাড়ি, নিজের জায়গা, নিজের মানুষজন সব ফেলে অন্য শহরে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে হয়েছিল।”
নীরার মা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মুখের রং ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। আবরার তিক্ত হেসে বলল—
— “জানেন আন্টি, কত বছর পর আমরা আবার এই শহরে ফিরেছি?”
সে কয়েক সেকেন্ড থামল।
— “যেদিন খবর পেলাম নীরার বাবা মারা গেছেন, সেদিনই প্রথমবার মনে হয়েছিল আমরা হয়তো আবার শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারব।”
কথাটা শুনে নীরার মায়ের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আবরারের চোখদুটো তখন দূরের কোথাও স্থির।
মনে হচ্ছে বহু বছরের পুরোনো ক্ষতগুলো আবার নতুন করে জেগে উঠেছে।
— “আপনি আজ আমার কাছে আপনার মনের ইচ্ছার কথা বলতে এসেছেন। কিন্তু তার আগে নীরাকে সব সত্যি বলুন।”
নীরার মা কাঁপা গলায় বললেন—
— “বাবা, আমি...”
আবরার মাথা নেড়ে তাকে থামিয়ে দিল।
— “না আন্টি, আজ আমাকে কিছু বলতে হবে না।”
— “নীরাকে বলুন তার বাবা কী করেছিলেন।”
— “বলুন কেন একটা ছেলেকে আর তার পরিবারকে নিজের শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল।”
— “বলুন কেন এতগুলো বছর আমরা নিজেদের জীবন নিয়ে যুদ্ধ করেছি।”
নীরার মায়ের চোখ ভিজে উঠল। তিনি বুঝতে পারছেন না কী বলবেন। এত বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা অতীত যেন হঠাৎ করে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আবরার এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—
— “আর সবচেয়ে বড় কথা...”
সে কিছুক্ষণ থামল।
— “আমি এখন আর একা না, আন্টি।”
নীরার মায়ের বুক ধক করে উঠল। আবরার শান্ত স্বরে বলল—
— “আমার জীবনেও এখন একজন মানুষ আছে।”
— “কয়েক মাস পর আমার বিয়ে।”
কথাটা বলেই সে এক মুহূর্তের জন্য চোখ নামিয়ে নিল।
তারপর আর কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে যেতে লাগল। নীরার মা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মনে হলো চারপাশের সব শব্দ যেন হঠাৎ দূরে সরে গেছে। জন্মদিনের অনুষ্ঠানের হাসি, বাচ্চাদের চিৎকার, অতিথিদের কোলাহল—কিছুই আর তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। শুধু বারবার আবরারের শেষ কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—
— “আমি এখন আর একা না...”
— “কয়েক মাস পর আমার বিয়ে...”
তার চোখ বেয়ে নীরবে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
হয়তো জীবনের কিছু ভুলের মাশুল মানুষকে অনেক দেরিতে এসে দিতে হয়। আর তখন আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
এরপর এলো কেক কাটার পালা। পুরো পার্টি সেন্টারের আলো যেন আরও ঝলমল করে উঠল। মাঝখানে বড় করে সাজানো তিন তলা নীল-সাদা কেক। চারপাশে নীল বেলুন, ফেয়ারি লাইট আর বাচ্চাদের আনন্দে ভরা কোলাহল। শুপ্তকে কেকের সামনে দাঁড় করানো হলো। সাফা আর মারওয়া তো খুশিতে আত্মহারা। দুজনেই শুপ্তর দুই পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
— “আমরাও কাটবো!”
— “আমরাও!”
তাদের উচ্ছ্বাস দেখে উপস্থিত সবাই হেসে উঠল। মৌসুমী মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলল,
— “আজকে শুপ্তর সঙ্গে কেক কাটবে ওর দুই স্পেশাল বন্ধু সাফা আর মারওয়া।”
সঙ্গে সঙ্গে হাততালিতে ভরে গেল চারপাশ। সাফা আর মারওয়ার মুখ আনন্দে চকচক করে উঠল। তিনজন মিলে ছুরিটা ধরল। তারপর সবাই একসাথে গুনতে শুরু করল—
— “ওয়ান... টু... থ্রি...”
কেক কাটা মাত্রই চারপাশে করতালির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
শুপ্ত প্রথম টুকরো কেক নিজের মা-বাবাকে খাইয়ে দিল।
তারপর সাফা আর মারওয়াও একে অপরকে কেক খাওয়াতে শুরু করল। পুরো পরিবেশটা আনন্দে ভরে উঠেছিল। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও আবরার আজ অদ্ভুতভাবে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল। সে এক কোণায় দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। সামনে এগিয়ে যায়নি। ছবি তুলতেও দাঁড়ায়নি। এমনকি কেক কাটার সময়ও দূর থেকেই দেখেছে। নীরা একসময় বিষয়টা খেয়াল করল।
তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। কয়েক ঘণ্টা আগেও আবরার সাফা আর মারওয়ার সঙ্গে খেলছিল, হাসছিল। কিন্তু এখন কেমন যেন চুপচাপ। মনে হচ্ছে হঠাৎ করেই মানুষটা অনেক দূরে সরে গেছে। কিন্তু কেন? সেটা নীরা বুঝতে পারল না। সে জানেও না কিছুক্ষণ আগে তার মা আর আবরারের মধ্যে কী কথা হয়েছে। তাই বিষয়টা মাথা থেকে সরিয়ে আবার অতিথিদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। কেক কাটার পর ধীরে ধীরে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শুরু হলো। অতিথিরা গল্প করছে, বাচ্চারা খেলছে, কেউ ছবি তুলছে। সময় কেটে যেতে লাগল। একসময় আবরার চুপচাপ সাফা আর মারওয়ার কাছে এগিয়ে গেল। দুই বোন তখন খেলায় ব্যস্ত। আবরার তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
— “প্রিন্সেসরা, আমি তাহলে যাই?”
সাফা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফুলিয়ে বলল,
— “এত তাড়াতাড়ি?”
মারওয়াও বলল,
— “আরেকটু থাকেন না।”
আবরারের বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে গেল। সে হেসে দুজনের গাল টিপে দিল।
— “আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।”
তারপর সে ইরফান ভাইয়ের কাছে গিয়ে বিদায় নিল।ইরফান ভাই অবাক হয়ে বললেন,
— “এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন?”
আবরার মৃদু হেসে বলল,
— “একটু কাজ আছে।”
মৌসুমীও দু-একবার থাকার জন্য বলল। কিন্তু আবরার আর রাজি হলো না। তার চোখ একবারও নীরার দিকে গেল না। আর নীরার সঙ্গেও দেখা করল না। চুপচাপ বিদায় নিয়ে পার্টি সেন্টার থেকে বের হয়ে গেল। নীরা দূর থেকে বিষয়টা লক্ষ্য করল। তার কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগল। সাধারণত আবরার বিদায় নেওয়ার আগে অন্তত একটা কথা বলত। আজ সেটাও বলল না। কিন্তু কেন এমন করল? নীরা উত্তর পেল না। পার্টি শেষ হতে হতে রাত অনেক হয়ে গেল। একে একে অতিথিরা বিদায় নিতে শুরু করল। মৌসুমী আর ইরফান সবাইক