02/11/2014
ইউরোপে ইন্টার্নশিপ করতে পারেন যেভাবে
তারিক রিদওয়ান
আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছি, সবার কাছেই ইন্টার্নশিপ নিয়ে খুব কৌতূহল কাজ করে। কিভাবে করবো, কোথায় করব, কেমন প্রজেক্টে কাজ করতে হবে, খুব বেশী পরিশ্রম করতে হবে কিনা, কিংবা অনায়াসেই ফাঁকি দিয়ে চালিয়ে দেয়া যাবে কিনা(!), ইত্যাদি হাজারো প্রশ্ন এবং কৌতূহল। যেহেতু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সুযোগ হয়নি, তাই সত্যি বলতে দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আসলে ইন্টার্নশিপের ব্যাপারে কৌতূহল কেমন এবং সেটা কিভাবে কাজ করে সে ব্যাপারে খুব বেশী একটা অভিজ্ঞতা নেই। তবে বন্ধুদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে বুয়েট/আইইউটি তে ইন্টার্নশিপ মাত্র একমাস, শুনে খুব খারাপ লেগেছিল। বাইরের সব দেশে যেখানে কমপক্ষে ৩ মাস, অনেক জায়গায় ৬ মাস, তখন দেশে মাত্র একমাস কেন?
আজ এই লেখাতে আমি আমার ইন্টার্নশিপ এর অভিজ্ঞতা শেয়ার করব যাতে যারা ভবিষ্যতে বিদেশে ইন্টার্নশিপ করার প্ল্যান করছেন (কিংবা প্ল্যান করেননি তবে লেখাটা পড়ার পর করবেন) এবং ইন্টার্নশিপের পর বিদেশে উচ্চশিক্ষা/চাকুরীর কথা ভাবছেন, তাদের জন্য কাজে দেয়।
আমি ইন্টার্নশিপ করেছিলাম গত বছর, ২০১৩ সালের ১৭ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, মোট ১২ সপ্তাহ (অথবা ৩ মাস)। আমার ভার্সিটির নিয়ম ছিল স্টুডেন্টরা চাইলে যেখানে ইচ্ছে ইন্টার্নশিপ করতে পারবে, তবে শর্ত একটাইঃ ফিল্ড সংক্রান্ত টপিকেই কাজ করতে হবে। অর্থাৎ মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র হয়ে গাড়ির মেকানিকগীরি, টায়ার চেঞ্জিং করলে চলবেনা, করতে হবে সত্যিকারের ইঞ্জিনিয়ারিং এর কাজ। যদিও আমার অনেক মালয়েশিয়ান বন্ধু এই কাজই করেছিল। ভেবেছিল ইন্টার্নশিপটা ঘরের পাশের গ্যারেজেই করি, সারাদিন টায়ার চেঞ্জ করলেও ৩ মাস তো বাসায় থাকা হবে। তাদের কথা আলাদা, তাদের সরকার থেকে চাকুরীর নিশ্চয়তা আছে, তাই উচ্চশিক্ষার দিকে ঝোঁক কম।
বিদেশে ইন্টার্নশিপ করার আইডিয়া প্রথমে আমার ছিলনা। তবে প্রথম থেকেই লক্ষ্য ছিল এখানে পড়ালেখা শেষ করে আরো ভাল কোথাও যেতে হবে। ভার্সিটির এক বড় ভাই আমেরিকাতে ইন্টার্নশিপ করতে যাবেন শুনে আমার মাঝেও ইচ্ছে জাগলো, যেহেতু বাইরে যাওয়ার ইচ্ছে পরবর্তীতে, আগেই ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে একটা অভিজ্ঞতা নিতে পারলে মন্দ কি? শুরু হলো খোঁজ করা।
খোঁজ দ্য সার্চ!
অনন্ত জলিলের খোঁজ দ্য সার্চ মুভিটা আজও দেখা হয়নি ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও, নায়ক অনন্ত এই মুভিতে কি খোঁজ করেছিলেন তাও জানিনা। তবে আমাকে ইন্টার্নশিপের জায়গা খুঁজে নিতে রীতিমত 'সেইরাম' এক খোঁজ দ্য সার্চ দিতে হয়েছিল। পশ্চিম ইউরোপ থেকে পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরপ্রাচ্য, ওশেনিয়া, আমেরিকা, চষে বেড়িয়েছি শুধুমাত্র একটা ইন্টার্নশিপের আশায়। রাত-দিন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল ল্যাপটপের স্ক্রিনে। যতদূর মনে পড়ে, দুই মাস ধরে ১৫০-টিরও বেশী জায়গায় অ্যাপ্লাই করার পর অফার পেয়েছিলাম মাত্র ৩ জায়গা থেকে। ধরে নিলাম ১৫০ জায়গাতেই অ্যাপ্লাই করেছি, তাহলে অনুপাত হচ্ছে প্রায় ৫০ঃ১। আর এই ১৫০ টি জায়গা খুঁজে বের করতে কমপক্ষে ৫০০ টি কোম্পানী অথবা রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ওয়েবসাইট ঘুরতে হয়েছিল। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত দু’টো কোম্পানী এবং একটি রিসার্চ ইন্সটিটিউট থেকে অফার পেয়েছিলাম।
সর্বপ্রথম অফার এসেছিল ইউকে'র কোন এক কোম্পানী থেকে, মনে নেই। ইন্টার্নশিপ অফার করলেও কোন এক রেগুলেশান এর কারণে আমাকে ভিসা দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হবেনা। আমি বললাম, ভিসা দিতে না পারলে ইন্টার্নশিপ অফার করে লাভ কি? বাদ দিয়ে দিলাম।
এরপর ভাল একটা অফার এলো ইতালীর তোরিনো (Torino, ইংরেজীতে Turin) শহরের একটা কোম্পানী থেকে। ফুটবলভক্তরা ভাল করেই জানেন তুরিনো'র ব্যাপারে। ইতালীর বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব, ‘জুভেন্টাস’ তো এ শহরেই। আমি ফুটবলের অন্ধভক্ত। ছোটবেলা থেকেই গল্প শুনে এসেছি জুভেন্টাসের, আর এর বিশ্বখ্যাত খেলোয়াড়দেরঃ রবার্তো ব্যাজ্জিও, দেল পিয়েরো, জিদান, পাভেল নেদ্ভেদ, ফ্যাবিও ক্যানাভারো, জানলুকা জাম্ব্রোত্তা, ডেভিড ত্রেজেগে, লিলিয়ান থুরাম... সবচেয়ে ভাল লাগতো ক্লাবটির ছদ্মনামঃ ‘দ্যা ওল্ড লেডী’। তুরিনো’র অফারটা পেয়ে মোটামুটি জোরে-শোরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ইতালী যাওয়ার ব্যাপারে।
কিন্তু আমার ভাগ্য আল্লাহ সেখানে লিখে রাখেননি। মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র আমি, তাই জার্মানীই ছিল আমার প্রথম টার্গেট উচ্চশিক্ষার জন্য। সেই সুবাদে ইন্টার্নশিপও সেখানেই করতে চেয়েছিলাম। যদিও ইতালি কোন অংশেই খারাপ না। তবে অবশ্যই ইতালি তো আর জার্মানী না! আরো বেশকিছু ব্যক্তিগত কারণে জার্মানী দেশটার প্রতি আমার আগ্রহ একটু বেশীই। শেষ পর্যন্ত অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর আমাকে অবাক করে দিয়ে জার্মানীর সেরা এক ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির রিসার্চ ইন্সটিটিউট থেকে অফার এলো। আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। বারবার ইমেইলটা পড়ে মনে হলো, নাহ স্বপ্ন তাহলে মনে হয় সত্যি হতে চলেছে!
জার্মানী!
বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম Gottfried Wilhelm Leibniz Universität Hannover, সংক্ষেপে Leibniz Universität Hannover (LUH), আর ইংরেজীতে University of Hannover হিসেবেই পরিচিত। LUH এর Institut für Turbomaschinen und Fluid-Dynamik (Institute of Turbo-machinery and Fluid Dynamics) থেকে অফারটা এসেছিল। তিনটা অফারের মধ্যে জার্মানীর অফারটাই সবদিক দিয়ে ভাল ছিল আমার জন্য। কারণ প্রথমত, যে প্রজেক্টে আমি কাজ করব সেটা আমার মত আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট এর কাজ করার সুযোগ পাওয়া মানেই বিশাল কিছু; এবং দ্বিতীয়ত, যেহেতু ভবিষ্যতে জার্মানীতে/ইউরোপে পড়ালেখা করার ইচ্ছা সেহেতু আগে থেকেই কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে আসা হবে।
বাইনারী নাম্বার, এবং Gottfried Wilhelm Leibniz
বাইনারী নাম্বার এর আবিষ্কারক Gottfried Wilhelm Leibniz এর নাম হয়তো আমরা সবাই জানি। যতদূর মনে পড়ে, স্কুল কিংবা কলেজে থাকতে বাইনারী নাম্বার যখন শিখেছিলাম তখন আবিষ্কারক হিসেবে ওনার নাম পড়েছিলাম। Leibniz Universität Hannover এর Logo টা হচ্ছে Gottfried Wilhelm Leibniz এর একটি চিঠির অংশবিশেষ, যা তিনি Wolfenbüttel এর তৎকালীন ডিউক রুডলফ অগাস্ট কে পাঠিয়েছিলেন। আর এই চিঠির মধ্যেই তিনি সর্বপ্রথম বাইনারী নাম্বার এর ব্যবহার দেখিয়েছিলেন।
Leibniz Universität Hannover এবং TU9
Leibniz Universität Hannover হচ্ছে জার্মানীর অন্যতম সেরা টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, TU9 এর সদস্য এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি লাইব্রেরী German National Library of Science and Technology (TIB) এই বিশ্ববিদ্যালয়েই অবস্থিত। TU9 German Institutes of Technology হচ্ছে জার্মানীর সবচেয়ে পুরনো এবং সেরা টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিগুলোর একটি জোট। Leibniz Universität Hannover ছাড়াও TU9 এর বাকি আট সদস্য হচ্ছেঃ
১) টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ মিউনিখ (Technische Universität München)
২) ইউনিভার্সিটি অফ স্টুটগার্ট (Universität Stuttgart)
৩) কার্লসরুহে ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলোজি (Karlsruhe Institute of Technology)
৪) আর ভি টে হা আখেন (RWTH Aachen)
৫) টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ বার্লিন (Technische Universität Berlin)
৬) টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ ডার্মস্টাড (Technische Universität Darmstadt)
৭) টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ ব্রাউনশোয়াইগ (Technische Universität Braunschweig)
৮) টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ ড্রেসডেন (Technische Universität Dresden)
আমার ইন্টার্নশিপ এর প্রজেক্টের টপিক
ইন্টার্নশিপে যে প্রজেক্টে কাজ করেছি সে ব্যাপারে একটু বিস্তারিত বলি। যারা এই ফিল্ডের নন তাদের হয়তো বুঝতে কষ্ট হবে, কিন্তু এই ফিল্ডের ছাত্র বা উৎসাহী ব্যক্তিরা যাতে বুঝতে পারেন/কৌতূহল মেটাতে পারেন সেজন্যই একটু বিস্তারিত বলতে চাই। আমার কাজ হচ্ছে কম্পিউটেশানাল ফ্লুইড ডাইনামিক্স (Computational Fluid Dynamics, সংক্ষেপে CFD) নিয়ে। ফ্লুইড মেকানিক্স এর একটি শাখা। শাখা বললে ভুল হবে, বরং ফ্লুইড মেকানিক্স এর গাণিতিক সমস্যাগুলো Computationally সমাধান করার ফিল্ডটাই হচ্ছে CFD.
ফিল্ডটা মোটামুটি পুরনো হলেও এর কাজ পুরোপুরি Computer-based হওয়ায় এর ডেভেলপমেন্ট শুরু হয়েছে বিগত কয়েক দশক ধরে। কারণ আগে কম্পিউটারের স্পীড তেমন বেশী ছিলনা, কিন্তু এখন সময়ের সাথে কম্পিউটারের স্পীড যেমন বাড়ছে এবং সাথে বাড়ছে এর উপর নির্ভরতা। তাই ফ্লুইড মেকানিক্স ছাড়াও অন্যান্য অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং ফিল্ডের সমস্যার সমাধান Computationally করা হচ্ছে, অর্থাৎ বিভিন্ন কোডিং/সফট্ওয়্যার এর মাধ্যমে করা হচ্ছে। CFD এর ক্ষেত্রে কোডিং করা হচ্ছে Fortran, Matlab, C++ ইত্যাদি এর মাধ্যমে। গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সফট্ওয়্যার, যেমনঃ Star-CCM+, ANSYS-Fluent, ANSYS-CFX, OpenFOAM ইত্যাদি। এর মধ্যে OpenFOAM সফট্ওয়্যারটি একটি Open Source Software এবং Linux based। যার কারণে দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে এবং ডেভেলপমেন্টও হচ্ছে অন্য সফ্টওয়্যারগুলোর তুলনায় বেশী। আর আমার ইন্টার্নশিপের প্রজেক্টটাও আমি করব OpenFOAM সফট্ওয়্যার দিয়েই। কিন্তু এর আগে IIUM এ ডঃ আসিফ এর সাথে যে প্রজেক্টে কাজ করেছিলাম সেটা ছিল MATLAB দিয়ে। তাই OpenFOAM আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন।
আমার সুপারভাইজর এর নাম বাস্তিয়ান ড্রেচশেল (Bastian Drechsel), জার্মান, পিএইচডি স্টুডেন্ট। মূলত বাস্তিয়ানের পিএইচডি-র একটা প্রজেক্টের কাজেই আমাকে হেল্প করতে হবে।
এতোক্ষণ নিজের আমার ইন্টার্নশিপের বিস্তারিত বললাম, এখন আসি অ্যাপ্লাই করার ধাপগুলো কি হবে এবং তার প্রস্তুতি কিভাবে হবে সে ব্যাপারেঃ
অ্যাপ্লাই করার সময়
বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়সূচীর উপর নির্ভর করে একেক জায়গায় একেক সময়ে ইন্টার্নশিপ হয়। তবে Summer এর সময়টা খুব বেশী জনপ্রিয় এবং এ সময়ের ইন্টার্নশিপটা Summer Internship হিসেবে পরিচিত।
অ্যাপ্লাই করা শুরু করতে হবে কমপক্ষে ১০ মাস আগে থেকে। এই সময় কোন ভার্সিটিতে সেমিস্টার থাকেনা, এটা সাধারণত জুন থেকে অগাস্ট পর্যন্ত চলে। আর ভাল জায়গায় অ্যাপ্লাই করতে হলে, যে বছর ইন্টাররশিপ করতে হবে তার আগের বছরের সেপ্টেম্বর থেকে অ্যাপ্লাই করা শুরু করা সবচেয়ে নিরাপদ। এরপর করলে যে পাওয়া যাবেনা তা ঠিক নয়, তবে না পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। আমি ২০১৩ সালের জুনে শুরু করব বলে প্ল্যান করেছিলাম, তাই অ্যাপ্লাই করা শুরু করা উচিত ছিল ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু একমাস দেরী করে অক্টোবরে শুরু করায় অনেক ভাল জায়গা থেকে রিপ্লাই পেয়েছিলাম যে জায়গা খালি নেই। যেমন ইউকে'র এক কোম্পানির রিপ্লাইঃ
"Dear X,
Many thanks for your application and it sounds like the CFD research you have undertaken is very interesting. Unfortunately there is little call at present for this in the UK office.
I have also spoken with our Danish office, which has a strong CFD department and unfortunately their internships are full for 2013.
Regards,
Nick”
আর ক'টা দিন আগে অ্যাপ্লাই করলেই হয়তো পেয়ে যেতাম।
কোন কোন দেশে অ্যাপ্লাই করব?
গোটা দুনিয়া আপনার জন্য উন্মুক্ত। যেখানে ইচ্ছা করেন। কোথাও না কোথাও হয়ে যাবে যদি সত্যিকারের চেষ্টা এবং আন্তরিকতা থাকে। এটা হল সেক্রেট অব সাক্সেস। টাকা-পয়সার জন্য কোনকিছু থেমে থাকেনা। যদিও আমার প্রথম টার্গেট ছিল জার্মানী, তাও অ্যাপ্লাই করেছিলাম সব জায়গাতেই, যাতে সুযোগ বাড়ে। ইউরোপের সবগুলো দেশ, বিশেষ করে জার্মানী, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালী, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, ইউকে, তুরস্কের কোম্পানীগুলোতে। আমেরিকা, কানাডাতে অ্যাপ্লাই করিনি এই দেশগুলোর ভিসা জটিলতার কারণে। একই কারণে পরবর্তীতে ইউকে তে অ্যাপ্লাই করাও বন্ধ করেছিলাম।
কিভাবে?
নিজেরা অনলাইনে ঘাটাঘাটি শুরু করলেই বুঝতে পারবেন প্রসেস টা আসলে কেমন। একেকজনের স্টাইল আবার একেকরকম, যদিও প্যাটার্ন একই।
নিচের কয়েকটি ধাপগুলো অনুসরণ করা যেতে পারেঃ
সিভি তৈরী
যেকোন জায়গায় অ্যাপ্লাই করার জন্য একটা সিভি আবশ্যক। একাডেমিক এবং প্রফেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড সংক্ষেপে তুলে ধরে এক পেইজের মধ্যে একটা সিভি তৈরী করা যেতে পারে। দুই পেইজ হলে সমস্যা নেই তবে এক পেইজ হওয়ায় বেশী শ্রেয়। কোন ফরম্যাট ব্যবহার করবেন এ নিয়ে সন্দিহান হলে Europass CV ফরম্যাট ব্যবহার করতে পারেন। Europass হচ্ছে European Union এর তৈরী একটি ফরম্যাট যা বিভিন্ন ধরনের ডকুমেন্টস তৈরী করার ক্ষেত্রে ইউরোপে ব্যবহৃত হয়, যাদের ভাষায়ঃ “…documents to make your skills and qualifications clearly and easily understood in Europe:” বিস্তারিত পাবেন এই লিঙ্কেঃ europass.cedefop.europa.eu/en/about. আর Europass CV অনলাইনেই প্রস্তুত করা যাবে Europass এর ওয়েবসাইট থেকেঃ europass.cedefop.europa.eu/editors/en/cv/compose.
অফিসিয়াল ইমেইল তৈরী
অফিসিয়াল ইমেইল হচ্ছে যে ইমেইল এর মাধ্যমে আপনি অ্যাপ্লাই করবেন। অনেক জায়গায় ওয়েবসাইট এ অ্যাপ্লাই করার অপশান তৈরী করা থাকে, সেখানে অফিসিয়াল ইমেইল দরকার হয়না। তবে যেসব জায়গায় এমন কিছু নেই বরং সরাসরি কারো সাথে যোগাযোগ করতে হবে অ্যাপ্লাই করার জন্য, সেক্ষেত্রে অফিসিয়াল ইমেইল খুবই জরুরী।
সঠিক জায়গা খুঁজে বের করা
কোথায় অ্যাপ্লাই করব, ব্যাপারটা কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। আমার কাজের ফোকাস research based হওয়ায় রিসার্চ ইন্সটিটিউটগুলোর দিকেই আমার আগ্রহ বেশী ছিল, তবে একসাথে কোম্পানিতেও অ্যাপ্লাই করেছিলাম।
কোম্পানী খুঁজে পাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে LinkedIn (www.linkedin.com). এটা একাডেমিক এবং প্রফেশনাল মানুষদের জন্য অসাধারণ এক নেটওয়ার্কিং ওয়েবসাইট। এখানে একটা একাউন্ট খুলে নিজের একাডেমিক এবং প্রফেশনাল বিস্তারিত বিষয়গুলো দিয়ে প্রোফাইলটি সুন্দরভাবে সাজিয়ে নিন।
LinkedIn এর Search Bar এ যে কোন টপিক এর নাম লিখলেই সেই টপিক রিলেটেড বিশ্বে যত কোম্পানীর LinkedIn একাউন্ট আছে সেগুলো show করবে। এখন বলতে গেলে সব কোম্পানীরই LinkedIn একাউন্ট আছে, তাই খুঁজে না পাওয়ার কোন প্রশ্নই আসেনা। Search Result টা খুব সুন্দর করে দেখা যায় LinkedIn এ। বাম পাশের প্যানেল এ দেশ/মহাদেশ অনুযায়ী সার্চ রেজাল্ট Filter করা যায়। সুতরাং আপনি যদি নির্দিষ্ট কোন দেশ/অঞ্চলের কোম্পানীর লিস্ট চান, তাহলে Filtering এ ঐ দেশ tick দিয়ে বাকিগুলো untick করে দিলেই ঐ দেশের কোম্পানীর নামগুলো চলে আসবে।
রিসার্চ ইন্সটিটিউট কয়েক ধরনের হতে পারে। বেশীরভাগ রিসার্চ ইন্সটিটিউট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকে। কিছু থাকে স্বাধীন, আবার কিছু থাকে কোম্পানীর অধীনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা ইন্সটিটিউটগুলোর খোঁজ পেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট এ গিয়ে, ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইট এ গেলেই ঐ ডিপার্টমেন্টের অধীনে যেসব ইন্সটিটিউট আছে তার লিস্ট পাওয়া যাবে। সেখান থেকে ইন্সটিটিউটের ওয়েবসাইটে যাওয়া যাবে। উদাহরণস্বরূপ, আমি যেমন Computational Fluid Dyanmics নিয়ে কাজ করতে চাই। অথবা বড় করে দেখলে Fluid Mechanics এ কাজ করতে চাই। তাই আমি বেশীরভাগ সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মেকানিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট ওয়েবসাইট এ গিয়ে খোঁজ নিতাম যে তারা আদৌ CFD নিয়ে গবেষণা করে কিনা। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে যে মেকানিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট এর অধীনেই CFD রিসার্চ হতো তাও না। কিছু জায়গায় ছিল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, কিছু জায়গায় অ্যাপ্লাইড মেকানিক্স ইত্যাদি ইত্যাদি। মূল কথা আপনি তো জানেন আপনার টপিক এর কাজ কোন কোন ডিপার্টমেন্টের অধীনে হতে পারে, সব ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইট এই ঢুঁ মারবেন।
ফান্ড ম্যানেজিং/স্পন্সরিং
অনেক ক্ষেত্রে তো যেখানে ইন্টার্নশিপ করবেন সেখান থেকেই আংশিক/পুরো ফান্ড পাওয়া যায়। আর পাওয়া না গেলে অনেক বড় একটা ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ইচ্ছা থাকলে ম্যানেজ হয় বলেই আমার বিশ্বাস। কারণ টাকার জন্য কোনকিছু আসলে থেমে থাকেনা। ইচ্ছেটাই আসল।
আমার ইন্টার্নশিপের সময় মালয়েশিয়া থেকে জার্মানী যাওয়া-আসা বিমান ভাড়া, ৩ মাসের থাকা-খাওয়ার খরচ সব মিলিয়ে হয়েছিল দুই হাজার ইউরো (প্রায় দুই লাখ টাকা)। এর বেশীরভাগই আমি আল্লাহর রহমতে ম্যানেজ করতে পেরেছিলাম বিভিন্ন জায়গায় স্পন্সর জোগার করার মাধ্যমে। এই পার্টটা ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। এমনকি সবকিছু ঠিকঠাক, যাওয়ার এক মাস আগেও কোন স্পন্সর কনফার্ম হয়নি। আল্লাহর অশেষ রহমতে ফ্লাইটের একদম ৭ দিন আগে ম্যানেজ হয়ে গিয়েছিল। ইন্টাররশিপের জন্য যত জায়গায় অ্যাপ্লাই করেছিলাম, স্পন্সরের ম্যানেজ করার জন্য মনে হয় এর চেয়ে বেশী জায়গায় অ্যাপ্লাই করেছিলাম। খুব সম্ভবত ২০০-র ও বেশী জায়গায়। মূল কথা আল্লাহ দেখেছিলেন যে তার এই বান্দা এমন পাগলের মত খুঁজে বেড়াচ্ছে, না দিলে অবিচার হয়ে যাবে! এজন্যই আবারো বলছি, ইচ্ছেটাই আসল।
দেশী-বিদেশী অনেক অনেক সংস্থা আছে যেখানে অ্যাপ্লাই করতে পারেন। এক্ষেত্রে নিজের দেশ অথবা যেদেশে ইন্টার্নশিপ করতে যাচ্ছেন সেদেশের কোম্পানিগুলো হচ্ছে সবচেয়ে সম্ভাবনাময়ী স্পন্সর। থার্ড-পার্টি দেশ থেকে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
আমাদের দেশে আসলে টাকা-পয়সার অভাব নাই। তবে অভাব আছে সততার, যার কারণে সম্পদের সঠিক বণ্টন নেই। থাকলে দুই লাখ টাকা ম্যানেজ করা কারো জন্যই কষ্টকর হতোনা। কিন্তু আমাদের অসততা এবং দুর্নীতির ফল আমরা নিজেরাই ভোগ করছি, কষ্ট পাচ্ছি।
শেষকথা
জার্মানীতে ইন্টার্নশিপ করার অভিজ্ঞতাটা আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অভিজ্ঞতাগুলোর একটা। এর উছিলায় পরে মাস্টার্সে ইউরোপের অনেক অনেক ভাল জায়গায় চান্স হয়ছিল আলহামদুলিল্লাহ। আমি বলবো আমার মাস্টার্স পড়ালেখার ফুল স্কলারশিপ এর জন্য দু’টো কারণ ছিল আর তার মধ্যে একটি ছিল জার্মানীতে ইন্টার্নশিপ। আর তাছাড়া আল্লাহর ইচ্ছে তো আছেই।
আপনার যদি সত্যিই স্বপ্ন থাকে অজানাকে জানার, আগ্রহ থাকে কোন বিশেষ টপিকে এবং সেজন্য কোন বিশেষ কিছু করতে চান, হতে পারে সেটা কোন ট্যুরে যাওয়া কিংবা বাইরের দেশে গিয়ে শিখে আসা; আমি বলবো এসব বিষয় মানুষের সাথে শেয়ার না করে নিজে নিজেই কাজ করে যান। কারণ মানুষের সাথে শেয়ার করলে মানুষ আপনাকে নিরুৎসাহিত করবে, বিশেষ করে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাপারটা বড়ই ভয়ঙ্কর। কোন কারণ ছাড়াই উঠেপড়ে লাগবে যাতে জীবনেও আপনার স্বপ্ন পূরণ না হয়। অন্য কোথায়, আপনার স্বপ্ন যাতে কোনদিন পূরণ না হয় সেটাই তাদের আজন্ম লালিত স্বপ্ন। এদের কথায় এবং কাজে আপনার স্বপ্ন নষ্ট হবে, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সব সুযোগও নষ্ট হবে। যার কারণে আমি আমার অ্যাপ্লাই করার সময় ব্যাপারটা কাউকে জানাইনি খুব ক্লোজ কয়েকজন সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী ছাড়া। আর যদি কাউকে জানাতাম, তাহলে হয়তো মানুষের কথা কানে না দিয়ে অ্যাপ্লাই করা শুরু করতাম ঠিকই। কিন্তু যেহেতু অ্যাপ্লাই শুরু করার এক/দুই মাসের মধ্যে ১০০-র ও বেশী জায়গায় অ্যাপ্লাই করার পরও কোন অফার আসেনি, স্বাভাবিক ভাবেই মানুষ নিরুৎসাহিত করতো, হাসির পাত্র বানাত, তখন ইচ্ছে আপনা-আপনিই উবে যেত। নিজেকে মনে হতো আমাকে দিয়ে এসব হবেনা!
মূল কথা, লেগে থাকুন, যা চান পেয়ে যাবেন, ইনশাল্লাহ।
লেখক ঃ চ্যালমার্স ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলোজি, সুইডেন এ মাস্টার্সরত