26/08/2023
কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথম পত্রের একটা সৃজনশীল প্রশ্ন নিয়ে ফেইসবুকে দেখি ব্যাপক সমালোচনা চলছে। ট্রল আর মিম এর মাধ্যমে ছয়লাব হয়ে গেছে অনলাইনের শিক্ষা রিলেটেড প্ল্যাটফরমগুলোতে।
এসব দেখেই আগ্রহ হলো প্রশ্নটা বিশ্লেষণ করার। যেমনটা মনে করেছিলাম, ঠিক তেমনটাই। যারা সমালোচনা করছে, তারা ঠিক কী বুঝে এভাবেই ট্রল করে বেড়াচ্ছে, আমি সত্যিই বুঝতে পারলাম না, দুঃখিত। একটু ব্যাখ্যা করে বলি।
কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের বাংলা প্রথম পত্রের একটা সৃজনশীল প্রশ্নের উদ্দীপকে একটা গানের অংশবিশেষ সেট করা হয়।
উদ্দীপকে যেই গানটি ছিলো—
ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাশে
বুঝছোনি ভাই বুঝছোনি, আসল কথা বুঝছোনি?
এক গেরামের গরিব চাষি কালা মিয়া নাম
সবার পেটে ভাত জুটাইতে ক্ষেত্রে ঝরায় ঘাম।
ও তার ছাওয়াল কান্দে ক্ষুধার জ্বালায়
মহাজনরা হাসে।
ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাশে।
সৃজনশীল প্রশ্নের নিয়ম অনুযায়ী উল্লিখিত উদ্দীপক অনুসারে অনুসারে ‘গ’ ও ‘ঘ’ প্রশ্ন করা হয়।
‘গ নং’ প্রশ্নে ছিল—
উদ্দীপকের ‘হাঁস’ ও ‘বাগডাশে’র সঙ্গে ‘লালসালু’ উপন্যাসের কোন কোন চরিত্রের মিল পাওয়া যায় এবং কীভাবে তা সাদৃশ্যপূর্ণ?
‘ঘ’ নং প্রশ্নে ছিলো—
জমিদার, মুৎসুদ্দি শ্রেণির বিলোপ হলেও আধুনিক পীর প্রথা সেই স্থান দখল করে আছে। - বক্তব্যটি উদ্দীপক ও লালসালু উপন্যাসের আলোকে বিচার করো।
যারা লালসালু উপন্যাসটি পড়েছেন, তারা ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে দেখবেন এই প্রশ্ন দু'টি খুবই যৌক্তিক এবং উল্লিখিত উদ্দীপকের গানটা লালসালু উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ।
ভণ্ড মজিদরা ধর্মের নামে মাজার ব্যবসা করে ফুলেফেঁপে উঠতে থাকে। গ্রামের মাতব্বর শ্রেণির লোকজনও যুক্ত হয়ে যায় সেই চক্রে। আর গ্রামের গরীব কৃষকরা এসব ভণ্ডদের কাছে তাদের কষ্টার্জিত অর্থকড়ি সম্পদ হারাতে থাকে।
এই অশিক্ষিত গরিবদের শুষে খেতে থাকে ভণ্ড মজিদরা।
এখন খেয়াল করে দেখুন তো প্রতীকী অর্থে তাহলে হাঁস মানে কোন চরিত্র আর বাগডাশ কোন চরিত্র? নিশ্চয়ই সহজেই রিলেট করতে পারছেন।
এখন আমাকে বুঝান তো এই প্রশ্নটা নিয়ে তাহলে ট্রল হচ্ছে কেন? এই সমালোচনার যৌক্তিকতা ঠিক কোথায়?
যদিও যেই উদ্দেশ্য নিয়ে সৃজনশীল সিস্টেম চালু করা হয়েছিলো, সেটা আদতে কোন কাজের না। স্টিল ওই বিদ্যমান সিস্টেমে অন্তত কিছুটা হলেও ক্রিয়েটিভিটির জায়গা তারা তৈরী করতে পেরেছে। স্টুডেন্টরা সাধারণত এক্সপেক্ট করে যায় বাংলা সৃজনশীল প্রশ্নে ' উদ্দীপকের গুরুত্ব অপরিসীম' টাইপ ছাইপাঁশ জিনিস লিখে ভরায়ে দিয়ে আসবে। অন্তত এই প্রশ্নটার উত্তর লিখতে গিয়ে স্টুডেন্টদের একটু হলেও চরিত্রগুলো রিলেট করতে চিন্তাভাবনা করতে হয়েছে, ভাবতে হয়েছে কিছুক্ষণ— এটাই তো ওই প্রশ্নের স্বার্থকতা। বস্তাপঁচা জিনিসের ভেতর কিছুটা হলেও ক্রিয়েটিভিটির জায়গা ছিলো সেখানে।
অনলাইন দুনিয়ায় এমন বহুকিছুই ঘটে, যেখানে কোন কারণ ছাড়াই সমালোচনা উঠে, এমনকি এমন মানুষও দেখা যায় যার ওই বিষয়টা নিয়ে বিন্দুমাত্র কোন আইডিয়া নাই, অথচ দেখাদেখি ট্রল করা শুরু করে দেয়। ভাইরে গড্ডলিকা প্রবাহের মত না চলে একটু বিচারবুদ্ধিও তো প্রয়োগ করতে পারেন। না জানলে অন্তত বুঝতে চেষ্টা করতে পারেন। তারপর না হয় ট্রল করলেন!
সমালোচনার পরিবর্তে আমি কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড এবং বাংলা প্রথম পত্রের ওই প্রশ্নের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বরং ধন্যবাদ জানিয়ে গেলাম। সত্যিকার অর্থেই সৃজনশীল প্রশ্ন করবার জন্য তারা ট্রল নয় বরং ধন্যবাদ ডিজার্ভ করে।
(সংগ্রহীত)