12/01/2026
প্রসঙ্গ সংস্কৃতির বাজেট
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সরাসরি গণমানুষের সাথে সম্পৃক্ত একটি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রনালয়ের বাজেট বরাদ্দ ও ব্যায়ের সাথে এর আওতাধীন সকল দপ্তর সংস্থা সম্পৃক্ত। সারাদেশে জেলা উপজেলায় এর কার্যক্রম ও দপ্তর রয়েছে। দেশের প্রতিটি মনুষ কোন না কোন ভাবে এই মন্ত্রণালয়ের অংশীজন। সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার সংগঠন এর অংশীজন হিসেবে বিভিন্নভাবে এই মন্ত্রণালয়ের সুবিধা ভোগ করে থাকেন। সংগঠক ও শিল্পীরা মন্ত্রণালয়ের দপ্তর সংস্থার মাধ্যমে অনুদান, ভাতা ও সহযোগিতা পেয়ে থাকেন। সুতরাং ”অতীতে এ মন্ত্রণালয়ের নাম শোনাও যেত না” আর গত এক বছরে সেই নাম শোনানোর ব্যবস্থা করেছেন। তাই বাজেটে বরাদ্দ বেশি হয়েছে। এধরনের কথা অবান্তর। এটা আমরা সবাই জানি।
এটা সত্যি যে, সারা দেশের যাথাযথ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের জন্য, সত্যিকারের সংস্কৃতির আলো ছড়িয়ে দেবার জন্য যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন তা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়েল বর্তমান বরাদ্দের তুলনায় নগন্য। এনিয়ে প্রতিবছর বাজেটের সময় সংস্কৃতিক কর্মীরা বাজেটের অন্তত এক শতাংশ সাংস্কৃতিক খাতে বরাদ্দের দাবি তোলেন। সেটিও যে কতটা যোক্তিক যা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। কারণ বর্তমানে যা বরাদ্দ দেওয়া হয়, মন্ত্রণালয় ও দপ্তর সংস্থার সক্ষমতার কারণে সেই বরাদ্দেরও উল্লেখযোগ্য একটা অংশ অব্যয়িত থাকে। অর্থাৎ শুধু বরাদ্দ বাড়ানো বা ব্যায় বাড়ানো স্থায়ী সমাধান নয়। মন্ত্রণালয় ও দপ্তর সংস্থার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। সাম্পতিককালে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গত পাঁচ বছরে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিচালন ব্যয় সর্বোচ্চ হওয়া প্রসঙ্গে “সাশ্রয়ের পথে নেই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বেশ সমালোচনার সূত্রপাত হয়। একজন সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে আমি সরাসরি এই মন্ত্রণালয়ের একজন অংশীজন। গত বেশ কয়েক বছর এই মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ ও ব্যায় এবং কার্যক্রমগুলো বিভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এটুকু নিশ্চিত বলতে পারি যে, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় কোন ক্রমেই গত একবছর সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বেশি হয়নি। বরং ২০২৪ সালে আওয়ামী সরকারের পতনের পর ছয় মাস চোখে পাড়ারমতো কোন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ছিলো না। কারণ, ছয় মাসে ৩জন মন্ত্রী/উপদেষ্টা পরিবর্ত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব, দপ্তর গুলোর প্রধানসহ গুরুত্বপূর্ন পদে পরিবর্তন হয়েছে। তাই আশানুরূপ কার্যক্রম না হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাকি সময়টাতে যে কাজ হয়েছে তা কোন ভাবেই পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে কম। এর প্রমান পাওয়া যাবে মন্ত্রণালয় এবং দপ্তর সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদন ও অর্থিক ব্যায়ের প্রতিবেদন থেকে।
প্রশ্ন হচ্ছে গত এক বছরে মন্ত্রণালয়ের পরিচালন ব্যায় বাড়ার পেছনের কারণ কি? নিম্নবর্ণিত কয়েকটি নিয়মিত কার্যক্রমের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের ব্যায় বৃদ্ধির হিসাব মেলানোর চেষ্টা করা যাক:
• মন্ত্রনালয় বা এর দপ্তর সংস্থাগুলোতে কতজন নতুন কর্মকর্তা বা কর্মচারি নিয়োগ দিয়েছে?
• মন্ত্রনালয়ের অওতায় প্রতি বছর যে শিল্পী ও সংগঠনের অনুদান প্রদান করা হয় তার হার কি বেড়েছে?
• সারাদেশে শিল্পকলা একাডেমির ছয়শতাধিক প্রশিক্ষক যারা দুই হাজার টাকা মাসিক ভাতা পান, তাদের ভাতার পরিমান বেড়েছে কি?
• জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস আয়োজন ও উদযাপন কতগুলো বেড়েছে?
• গবেষণার বরাদ্দ থেকে বিশেষ কোন গবেষণা হয়েছে কি?
• আন্তার্জাতিক পর্যায়ে সাংস্কৃতিক দল প্রেরণ পূর্বের তুলনায় কতখানি বেশি হয়েছে?
• শিল্পকলা একাডেমিতে কতগুলো চলচ্চিত্র উৎসব ও নাট্য উৎসবের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে?
• বাংলা একাডেমিতে কি গত বছর খুব বেশি সংখ্যক বই প্রকাশিত হয়েছে?
• সারা দেশে গ্রন্থাগার অনুদান ও গ্রন্থাগারে বই বিতরণ কি বাড়ানো হয়েছে?
• গত এক বাছরে সারা দেশে নতুন প্রত্ন স্থাপনার সংখ্যা কয়টি বেড়েছে বা সংস্কার হয়েছে?
এরকম অসংখ্য পরিমাপক রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন বছরের সাথে গত এক বছরের ব্যায়ের সামঞ্জস্যতা নির্ণয় করা সম্ভব। এখানে মোটা দাগে কয়েকটি উল্লেখ করলাম।
এবার দেখি গত এক বছরে মন্ত্রণালয় ও এর দপ্তর সংস্থায় কি কি কাজ হয়েছে। মন্ত্রনালয়ের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশ্লেষণ করলে যে কেউ এই হিসাব পেয়ে যাবেন। তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন দপ্তর সংস্থার কাজগুলি এখন মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা। তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সচ্ছতা যেমন ব্যহত হচ্ছে তেমনি স্বায়ত্বশাসন সংস্থাগুলোর স্বায়ত্বশাসনের পরিবর্তে সৈরস্বাশন প্রতিষ্ঠত হচ্ছে।
সংবাদ প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা যেসব নতুন কার্যক্রমের কথা বলার চেষ্টা করেছেন, সেগুলো খুব একটা নতুন কিছু মনে হয়নি। একই ধরনের অনুষ্ঠান শুধু আয়োজনে ভিন্নতা। সৃজনশীলতার দিক থেকে চিন্ত করলে অনুষ্ঠান আয়োজনে একটি থেকে অন্যটিতে ভিন্নতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। মন্ত্রনালয়ের বরাতদিয়ে সংবাদ প্রতিবেদনে বেশ কিছু অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, বুঝার সুবিধার্থে যার কিছুটা এখানে উল্লেখ করছি।
“সব ধর্ম ও জাতির অংশগ্রহণে নববর্ষ উদযাপন, ঈদ, বুদ্ধপূর্ণিমা ও দুর্গা পূজা জাতীয় পর্যায়ে আয়োজন করা হয়েছে। প্রথমবার রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়েছে ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস। দেশজুড়ে বেসরকারি সংগীত স্কুলকে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। উদ্যোগ নেয়া হয়েছে শিল্পকলা একাডেমিতে সংগীত বিভাগের আধুনিকায়ন ও অনলাইন কার্যক্রম সম্প্রসারণের। এছাড়া ‘নদীপথে সুরভ্রমণ’ অডিও ভিজ্যুয়াল প্রকল্প, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদী শাসন বিষয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর, জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালা, আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘বাংলাদেশ জুলাই মেমোরিয়াল প্রাইজ’, ইউনেস্কো ও চীনে সাংস্কৃতিক আয়োজনসহ আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। পাশাপাশি দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটে সাংস্কৃতিক উৎসব, কিংবদন্তি শিল্পীর স্মরণ এবং ইতিহাসের নির্মোহ উপস্থাপনার মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার লক্ষ্য সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।”
যার মধ্যে বুদ্ধপূর্ণিমা ও দুর্গা পূজা উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানকে ব্যতিক্রমী উদ্দ্যোগ মনে হয়েছে কারণ এধরনের অনুষ্ঠান ইতিপূর্বে কখনো সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আয়োজন হতে দেখিনি। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদী শাসন বিষয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর, জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালা, আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘বাংলাদেশ জুলাই মেমোরিয়াল প্রাইজ’ কার্যক্রম হয়েছে। এই আয়োজন গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তি যোক্তিক আয়োজন হয়েছে এবং প্রশংসনীয়।
পাশাপাশি চীনে ড্রোন প্রশিক্ষণে একটি দল পাঠানো হয়েছে তার কোন সুফল আমরা দেখতে পাচ্ছি না। প্রথমবার রাষ্ট্রীয়ভাবে ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস আয়োজনের বিষয়টি সম্পূর্ন অসত্য। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে একধিকবার তিন দিনব্যাপী লালন শাহের তিরোধান দিবস আয়োজন করতে দেখেছি। ইউটিউবে খোঁজ নিলেই এসব আয়োজনের সচিত্র প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। এছাড়াও শিল্পকলা একাডেমির মাঠে প্রতি মাসে সাধু সংঘ হতে দেখেছি। যা এখন আর হয় না। দেশজুড়ে বেসরকারি সংগীত স্কুলকে অর্থনৈতিক প্রণোদনা এই মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম। সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জান নূর এই কার্যক্রমের শুরু করেছিলেন। তারপর থেকে প্রতিবছর এই প্রণোদনা প্রদান করা হয়। শিল্পকলা একাডেমিতে সংগীত অনলাইন কার্যক্রম সম্প্রসারণে করোনা মহামরির শুরু হয়েছিলো। কিংবদন্তি শিল্পীদেরকে স্মরণ অনুষ্ঠানও বহুবছর যাবৎ নিয়মিত আয়োজন হতে দেখেছি। সুতরাং তালিকা ভারি করার জন্য এভাবে গোজামিল দিয়ে শুধু বললেই হয় না। একজন উপদেষ্ঠার কাছ থেকে এধরনের মিত্যাচার কোন ভাবেই কাম্য নয়। বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে গত ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে কোন আয়োজন লক্ষ করা যায় নি। এটিও একটি ব্যতিক্রম ঘটনা।
পরিশেষে বলবো, এক বছর দায়িত্ব পালন করে ব্যয় বৃদ্ধি করলেই যথাযথ দায়িত্ব পালন করা হয় না। একটা মন্ত্রণালয়কে বুঝতেই কয়েক বছর প্রয়োজন হয়। সেখানে ব্যায় সাশ্রয়ের পথই ছিলো বুদ্ধিমানের কাজ। গত এক বছরের আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত শিল্পী ও সংগঠকে সংখ্যা যদি পূর্বের পাঁচ বছরের চেয়ে যদি বেশি হতো। তাহলেই কেবল মাত্র উপদেষ্টার দাবি যথার্থ হতো। যে কোন আয়োজনের ব্যয় বৃদ্ধি খুব সহজ কাজ। একটা আয়োজনের মান উন্নয়ন করতে গিয়ে ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে যদি ৫ লাখ খরচ করা হয়, তাহলে ব্যায় বৃদ্ধিই স্বাভাবিক।
Send a message to learn more