22/09/2024
বাংলা থ্রিলার গল্প: "ছায়ার মধ্যে রহস্য"
রাত গভীর। শহরের সব রাস্তাগুলো যেন নিস্তব্ধতায় ঢেকে গেছে। আকাশে পূর্ণিমার আলো মিটমিট করছে, কিন্তু তার রশ্মি গলির অন্ধকারে পৌঁছাতে ব্যর্থ। শফিক একটু আগেই তার বন্ধুর কাছ থেকে অদ্ভুত একটি ফোন পেয়েছিল। ফোনের ওপাশ থেকে ভাঙা ভাঙা স্বরে কেউ বলে উঠেছিল, "তোর জীবন এখন বিপন্ন, শফিক। রাত বারোটার মধ্যে যদি পুরনো গুদামঘরে না পৌঁছাস, সব শেষ।"
শফিকের মন তখন দোদুল্যমান। ফোনটা সত্যি না কি মিথ্যা, সে বুঝে উঠতে পারছিল না। কিন্তু বুকের গভীর থেকে যেন কেউ বলছিল, কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। অনেকদিন ধরেই তার আশেপাশে কিছু ছায়ামানুষের অস্তিত্ব টের পাচ্ছিল সে, কিন্তু প্রমাণ করতে পারছিল না।
সে যখন গুদামঘরে পৌঁছল, ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক বারোটা ছুঁই ছুঁই। জায়গাটা পুরনো, ধ্বংসপ্রায়; সবকিছুতেই যেন একটা অদ্ভুত শূন্যতা। হঠাৎ করেই তার পেছনে কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেল শফিক। সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
হঠাৎ করে অন্ধকারের মধ্যে থেকে একটা ছায়ামূর্তি উদয় হলো। হাতে একটি পুরনো চাবি। ছায়ার মধ্যে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার হাড়কাঁপানো গলা বলে উঠল, "তোর সময় ফুরিয়ে আসছে। সত্যিটা জানার জন্য তৈরি হয়ে যা।"
শফিকের শরীর জুড়ে হিমশীতল বাতাস বয়ে গেল। কে এই ছায়ামানুষ? তার জীবন কেন বিপন্ন? এই চাবির পেছনের রহস্যই বা কী? রাত গভীর হতে থাকল, আর তার সাথে বাড়তে থাকল শফিকের মনের অজানা ভীতি।
শফিকের কণ্ঠ যেন গলায় আটকে গেল। ছায়ামূর্তিটা তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অন্ধকারে তার চেহারা অস্পষ্ট। চাবিটা তার দিকে এগিয়ে ধরে বলল, "এই চাবিটা তোর জন্য। পুরনো শহরের সেই বাড়িটা মনে আছে? সেখানে যা, উত্তর তুই পাবি।"
শফিক দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে চাবিটা হাতে নিল। মনে পড়ে গেল সেই পুরনো বাড়িটার কথা—একটা পরিত্যক্ত অট্টালিকা, যেখানে সে ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যেত। অনেক বছর ধরে সেই বাড়িতে কেউ যেত না, কারণ সেটা নিয়ে অনেক গুজব ছিল। স্থানীয়রা বলত, ওই বাড়িটা অভিশপ্ত।
ছায়ামূর্তিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, যেন অন্ধকার তাকে গ্রাস করে নিল। শফিক কিছুক্ষণ সেখানে স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল। তার মনের ভেতর হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, কিন্তু কোনো উত্তর নেই। সে জানে, এই চাবি আর সেই বাড়ি তাকে সত্যের কাছে নিয়ে যাবে, কিন্তু সেই সত্য কেমন হবে, তা ভাবতেই শফিকের বুক ধকধক করতে লাগল।
কোনোভাবে মনকে শক্ত করে সে ঠিক করল, এই রহস্যের শেষটা দেখা দরকার। বাড়িটা শহরের উপকণ্ঠে, গলির ধারে এক পরিত্যক্ত জায়গায়। গাড়ি নিয়ে সেখানে পৌঁছাতে তার বেশ কিছুটা সময় লাগবে, কিন্তু সে থামবে না।
গাড়ির ইঞ্জিন চালু করতেই, একটা অদ্ভুত শীতল অনুভূতি তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। পূর্ণিমার আলোতে রাস্তা দেখতে পেলেও, শহরটা যেন আরও বেশি নিস্তব্ধ হয়ে উঠেছে। চারদিকের নিস্তব্ধতা শফিকের মনের অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিল।
যখন বাড়িটার কাছাকাছি পৌঁছল, শফিক দেখতে পেল সেটি আগের মতোই ভাঙাচোরা আর শূন্য। কিন্তু আজকের রাতটা অন্যরকম। সে অনুভব করল, বাড়ির চারপাশে কেউ আছে। কেউ তাকে দেখছে, অদৃশ্য চোখের সামনে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে।
গাড়ি থেকে নেমে সে চাবিটা শক্ত করে ধরে বাড়ির দরজার দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ করেই একটা কোল্ড বাতাসের ঝাপটা তার গায়ে লাগল। বাতাসের মধ্যে একটা ফিসফিসে কণ্ঠ শোনা গেল, "সতর্ক থাক, শফিক। সত্য সবসময় সহজ হয় না।"
শফিকের হাতটা হঠাৎই থেমে গেল।
শফিকের হাতটা দরজার সামনে স্থির হয়ে গেল। সে জানে, একবার এই চাবিটা দিয়ে দরজা খুললে, তার জীবন আর আগের মতো থাকবে না। তবুও, তার কৌতূহল ভয়কে জয় করে। সে ধীরে ধীরে চাবিটা ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে দিল।
দরজাটা খুলতেই একটা ভেজা, পুরনো কাঠের গন্ধ নাকে এসে লাগল। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার, শুধু পূর্ণিমার আলো জানালার ফাঁক দিয়ে একটু একটু করে ঢুকছে। সে টর্চটা বের করে সামনের দিকে আলোকিত করল। ধুলায় মোড়া সব আসবাব, যেন বছরের পর বছর কোনো প্রাণের স্পর্শ পায়নি।
হঠাৎই, ঘরের এক কোণ থেকে মৃদু শব্দ শোনা গেল। শফিক ধীরে ধীরে সেই দিকে এগোল। তার পা যেন জমে আসছে, প্রতিটা পদক্ষেপ যেন তাকে গভীর কোনো বিপদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কোণের দিকে তাকাতেই শফিকের গলা শুকিয়ে গেল—একটা মৃতদেহ পড়ে আছে মেঝেতে।
দেহটা দেখে বোঝা যাচ্ছে, মৃত্যুর আগে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল। চোখ দুটো ভয়ে স্থির হয়ে আছে, আর গলা কাটা। চারপাশে ছড়িয়ে আছে রক্ত। শফিক পেছনে হটতে শুরু করল, কিন্তু ঠিক তখনই একটা কর্কশ আওয়াজ পেছন থেকে ভেসে এল—"এটাই তোর ভবিষ্যৎ।"
শফিক দ্রুত পেছনে ঘুরল। দরজার সামনে একটা ছায়ামানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এবার মুখ দেখা যাচ্ছে—রক্তমাখা একটা হাসি তার ঠোঁটে। শফিক দৌড়াতে চাইল, কিন্তু পা এক ইঞ্চিও সরল না। ছায়ামানুষটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ ঘরের মধ্যে বাতাসের গতি বাড়ল, জানালার কাঁচ কাঁপতে শুরু করল, আর সেই হাসিটা আরও ভয়ানক হয়ে উঠল।
"তুই পালাতে পারবি না, শফিক। সত্য তোর কাছেই আসছে। আর এই সত্য ভয়ানক।"
শফিকের মাথা ঘুরে গেল, শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে। হঠাৎই ঘরের ভেতর আলোর ঝলকানি! একটা মুহূর্তের জন্য সবকিছু স্থির হয়ে গেল, আর শফিকের সামনে ছায়ামানুষটি মিলিয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার কপাল থেকে ঘাম ঝরছে।
বাইরে একটা গাড়ির হর্ন বাজল। শফিক ধীরে ধীরে দরজার দিকে তাকাল, কিন্তু মনে হচ্ছে কিছুই আগের মতো থাকবে না।
শফিকের মনে আতঙ্ক জেঁকে বসেছিল। কিন্তু কিছু সময় পর, সে নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করল। তার মাথার মধ্যে যেন একটা অদ্ভুত খটকা লাগছিল। সবকিছু এতই অবিশ্বাস্য লাগছে—ছায়ামানুষ, গুদামঘর, আর এই খুন! কিন্তু... কিছু একটা ঠিক মিলছে না।
সে আরেকবার ঘরের চারপাশে চোখ বুলাল। মৃতদেহটা অদ্ভুতভাবে যেন খুব বাস্তব, অথচ পুরো দৃশ্যটা কেমন যেন বানানো মনে হচ্ছিল। সে একটু ভালোভাবে দেখতে শুরু করল। রক্তটা... ঠিকঠাক জমাট বাঁধেনি, আর দেহটা থেকে তেমন কোনো দুর্গন্ধও আসছে না, যা সাধারণত এতটা সময় পর আসা উচিত।
শফিক হঠাৎ করেই মুচকি হাসল। সত্যিটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে আসছিল। সে মৃতদেহের কাছে গিয়ে একটু ঠেলে দেখল। দেহটা পুতুলের মতো গড়িয়ে গেল! এটা আসলেই একটা পুতুল!
"আচ্ছা, তাই তো!" শফিক উচ্চস্বরে বলল। "এটা একটা প্র্যাঙ্ক!"
ঠিক তখনই, ঘরের কোণ থেকে হাসির শব্দ ভেসে এল। শফিক দ্রুত চারপাশে তাকাল, আর তখন তার দুই বন্ধু, রনি আর তানিম, এক কোণ থেকে বেরিয়ে এল। দুজনের মুখে হাসির ঝিলিক।
"হ্যাঁ, শফিক! তুই তো ধরেই ফেলেছিস!" রনি বলল। "আমরা তোকে একটু ভয় দেখানোর জন্যই এই আয়োজন করেছিলাম!"
শফিক এবার পুরোপুরি হেসে উঠল। তার ভয় যেন মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। "তোমরা দুজনও, আজকে তো ভালোই বোকা বানালে! পুতুল আর রক্তের মেকআপটা দারুণ ছিল!"
তানিম মুচকি হেসে বলল, "হ্যাঁ, আমরা জানতাম যে তুই সাহসী, কিন্তু একটু পরীক্ষা তো করা দরকার ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তুই বুঝে গেছিস!"
শফিক হেসে বলল, "আচ্ছা, ঠিক আছে, মজা তো হলো। কিন্তু একবার ভেবেছিলাম, আমি কোনো ভয়ংকর রহস্যে জড়িয়ে গেছি!"
তিন বন্ধু হেসে উঠল। পুরনো বাড়ির ভুতুড়ে আবহাওয়াটা এখন আর তেমন ভয়ের কিছু মনে হচ্ছে না। পুরো ব্যাপারটাই যে একটা মজা ছিল, তা বুঝে শফিকের মন পুরোপুরি হালকা হয়ে গেল।
তারা তিনজন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল, আকাশে এখনো পূর্ণিমার আলো মিটমিট করছে। শফিকের মনে তখন একটাই কথা—এই প্র্যাঙ্কের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তার বন্ধুরা একদিন বড়সড় কিছু পাবে!