07/06/2026
১ম পর্ব:
শরীরের প্রতিটি শিরায় যেন আগুন জ্বলছে।
ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই অনুভব করলাম আমার দুই হাত পেছনে শক্ত করে বাঁধা। বুকের ভেতর ধকধক শব্দ হচ্ছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। মুখের ডান পাশে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের স্তর জমে আছে।
চারপাশে তাকিয়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
আমার মতো আরও অনেক মানুষ মোটা কালো গাছের সঙ্গে বাঁধা। কেউ কাঁদছে, কেউ মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, কেউবা নিথর হয়ে ঝুলে আছে।
আমাদের মাথার ওপরে বিশাল এক অরণ্য। এত ঘন যে সূর্যের আলো পর্যন্ত মাটিতে পৌঁছাতে পারছে না।
হঠাৎ কোথাও থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এলো—
"কেউ আছেন? আমাকে বাঁচান!"
কণ্ঠটি শুনেই বুক কেঁপে উঠল।
আমি তাকে চিনি।
নিশ্চয়ই চিনি!
কিন্তু কীভাবে?
চোখ বন্ধ করে স্মৃতির ভেতর ডুব দিলাম।
☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆
দুই ঘণ্টা আগেও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল।
আমি চাকরির শহর থেকে গ্রামের বাড়ি ফিরছিলাম। অনেকদিন পর মা-বাবার সঙ্গে দেখা হবে। ছোট ভাইটা প্রতিদিন ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছিল, "আপু, কবে আসবা?"
তাই আজকের যাত্রা নিয়ে আমার উচ্ছ্বাসের শেষ ছিল না।
কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
বাসে উঠেই বুঝলাম এটি একটি শিক্ষা সফর থেকে ফেরা দলের বাস।
ছাত্র-ছাত্রীদের হৈচৈ, গান, গল্পে পুরো পরিবেশ সরগরম।
আমি শেষ সারির জানালার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
ঠিক তখনই পাশে এসে বসলেন একজন বৃদ্ধ শিক্ষক।
তার সাদা দাড়ি, শান্ত চোখ আর অদ্ভুত গম্ভীর চেহারা ছিল।
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
"তুমি কি কখনো এমন অনুভব করেছ, যেন কেউ তোমাকে দেখছে?"
প্রশ্নটা শুনে আমি অবাক হলাম।
"জি?"
তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
"কিছু পথ আছে, যেখানে পথিকেরা একা থাকে না।"
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
"আপনি কী বলতে চাইছেন?"
বৃদ্ধ শিক্ষক মৃদু হাসলেন।
"কিছু না। হয়তো বয়স হয়েছে।"
কথাটা বলে তিনি চুপ হয়ে গেলেন।
কিন্তু তার কথাগুলো আমার মাথা থেকে সরছিল না।
বাস পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে এগোচ্ছিল।
হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এলো।
যেন কয়েক মিনিটের মধ্যে বিকেল থেকে রাত নেমে এসেছে।
ছাত্র-ছাত্রীরা ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেল।
ড্রাইভারও অস্থির দেখাচ্ছিল।
ঠিক তখনই আমি দেখলাম রাস্তার মাঝখানে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।
লম্বা।
অস্বাভাবিক লম্বা।
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
ড্রাইভার হর্ন বাজাল।
মূর্তিটি নড়ল না।
আর পরের মুহূর্তেই—
ধাম!
প্রচণ্ড শব্দ।
বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে গেল।
সবকিছু অন্ধকার।
☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆
চোখ খুলতেই আবার বর্তমানের সেই ভয়ংকর বাস্তবতা ফিরে এলো।
আমরা সবাই বাঁধা।
কিন্তু কেন?
কারা আমাদের এখানে এনেছে?
ঠিক তখনই দূরের অন্ধকারে একে একে জ্বলে উঠল কয়েক জোড়া লাল চোখ।
প্রথমে দুটি।
তারপর চারটি।
তারপর দশটি।
তারপর...
গণনা করার মতো সংখ্যাও আর রইল না।
আমার পাশের একজন কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,
"ওরা এসে গেছে..."
"কারা?"
লোকটি আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে এমন আতঙ্ক ছিল, যা আমি আগে কখনো দেখিনি।
সে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
"যারা এই জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের আর কখনো ফিরতে দেয় না।"
আর ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে ভারী পদশব্দ ভেসে এলো।
ধুপ...
ধুপ...
ধুপ...
শব্দগুলো আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছিল।
চলবে......