15/06/2026
পর্দার বিধান অস্বীকারকারী বা অবমাননাকারী কি কাফের?
কুরআন, সুন্নাহ ও ফকীহগণের ফতোয়ার আলোকে
ভূমিকা
পর্দা ইসলামের একটি সুস্পষ্ট ও অপরিহার্য বিধান। পবিত্র কুরআন, সহিহ হাদিস এবং মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত মতামত দ্বারা এটি প্রমাণিত। তাই কোনো মুসলমানের জন্য পর্দার বিধানকে অস্বীকার করা বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়।
তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পর্দা পালন না করা, পর্দার ফরজ হওয়া অস্বীকার করা এবং পর্দাকে উপহাস করা—এ তিনটির হুকুম এক নয়। তাই এ বিষয়ে সঠিক শরয়ি অবস্থান জানা জরুরি।
পর্দা ফরজ হওয়ার দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«“আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে... আর তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশের উপর টেনে দেয়।”
(সূরা আন-নূর: ৩১)»
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন:
«“হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন নিজেদের উপর তাদের চাদরের অংশ ঝুলিয়ে দেয়। এতে তাদেরকে সহজে চেনা যাবে এবং তারা কষ্টপ্রাপ্ত হবে না।”
(সূরা আল-আহযাব: ৫৯)»
এই আয়াতসমূহ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম নারীর জন্য শরয়ি পর্দা পালন করা ফরজ।
হাদিসের দলিল
হযরত আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেন:
«“যখন ‘তারা যেন নিজেদের ওড়না বক্ষদেশের উপর টেনে দেয়’—এই আয়াত নাযিল হলো, তখন আনসার নারীরা নিজেদের কাপড় ছিঁড়ে তা দ্বারা নিজেদের আবৃত করলেন।”
(সহিহ বুখারি)»
এ থেকে বোঝা যায়, সাহাবিয়াগণ পর্দার বিধানকে ফরজ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং তা বাস্তবে পালন করেছিলেন।
পর্দা না করলে কি কাফের হবে?
যে নারী বা ব্যক্তি পর্দা ফরজ বলে বিশ্বাস করে, কিন্তু প্রবৃত্তির অনুসরণ, সমাজের চাপ বা গাফিলতির কারণে পর্দা পালন করে না, সে অবশ্যই গুনাহগার হবে। তবে শুধুমাত্র পর্দা না করার কারণে সে কাফের হয়ে যাবে না।
কারণ, ফরজ কাজ ত্যাগ করা এক জিনিস, আর ফরজ হওয়া অস্বীকার করা আরেক জিনিস।
পর্দার ফরজ হওয়া অস্বীকার করলে কী হুকুম?
যদি কোনো ব্যক্তি জেনে-শুনে বলে:
- পর্দা ইসলামে ফরজ নয়;
- কুরআনের এই বিধান মানি না;
- এই বিধান বর্তমান যুগে প্রযোজ্য নয়;
তাহলে সে ইসলামের এমন একটি বিধান অস্বীকার করল, যা দ্বীনের অপরিহার্য ও সর্বজনবিদিত বিষয়।
ফকীহগণ বলেন:
«“দ্বীনের এমন কোনো বিষয় অস্বীকার করা, যা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট সুপরিচিত ও অপরিহার্যভাবে জানা বিষয়, কুফরি।”»
হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’-এ উল্লেখ আছে:
«“দ্বীনের অপরিহার্যভাবে জানা কোনো বিষয় অস্বীকার করা কুফর।”»
পর্দাকে উপহাস বা অবমাননা করলে কী হুকুম?
কেউ যদি হিজাব, নিকাব, শরয়ি পর্দা কিংবা ইসলামের অন্য কোনো বিধানকে উপহাস করে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বা বিদ্রূপ করে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত মারাত্মক।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«“আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূলকে নিয়ে উপহাস করছিলে? তোমরা কোনো অজুহাত পেশ করো না; তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করেছ।”
(সূরা আত-তাওবা: ৬৫-৬৬)»
এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের কোনো সুস্পষ্ট বিধানকে বিদ্রূপ করা কুফরির অন্তর্ভুক্ত।
আলেমদের বক্তব্য
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
«“যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনের কোনো অংশকে উপহাস করে, মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত মতে সে কাফের।”»
কাজী ইয়াজ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
«“আল্লাহ, তাঁর রাসূল অথবা শরিয়তের কোনো বিধানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা কুফর।”»
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
তবে কোনো কাজ বা বক্তব্য কুফরি হওয়া এক বিষয়, আর নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে কাফের ঘোষণা করা আরেক বিষয়।
কারণ, কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে কুফরের হুকুম প্রয়োগ করার আগে তার অজ্ঞতা, ভুল ব্যাখ্যা, জোরপূর্বক বাধ্য হওয়া কিংবা অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
এ কারণে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর কুফরের ফতোয়া দেওয়া বিজ্ঞ মুফতি ও যোগ্য আলেমদের কাজ; সাধারণ মানুষের কাজ নয়।
উপসংহার
সংক্ষেপে বলা যায়—
১. পর্দা ইসলামের একটি ফরজ বিধান।
২. পর্দা না করলে মানুষ গুনাহগার হবে, কিন্তু কাফের হবে না।
৩. পর্দার ফরজ হওয়া জেনে-শুনে অস্বীকার করলে তা কুফর হতে পারে।
৪. পর্দা বা ইসলামের কোনো বিধানকে উপহাস, বিদ্রূপ বা অবমাননা করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ এবং তা কুফরির পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে।
৫. তবে নির্দিষ্ট কাউকে কাফের বলা সাধারণ মানুষের কাজ নয়; এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের শরণাপন্ন হতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের সকল বিধান যথাযথভাবে মানার, সম্মান করার এবং কুরআন-সুন্নাহর পথে অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।