02/03/2023
শ্রীমঙ্গলীয় চা
চা সম্পর্কে এমন অনেক চমকপ্রদ তথ্য রয়েছে যা হয়তো সবচেয়ে বেশি চায়ে আসক্ত ব্যক্তিটিও জানেনা। আজকে আপনার হাতে ধূমায়িত এক কাপ চায়ের পেছনে রয়েছে উটের কাফেলা, পারলৌকিক প্রয়োজন এবং বিপ্লব-এর চমকপ্রদ ইতিহাস।
চা খাওয়ার উপকারিতা
সারাদিন আপনার পান করা পানীয়র মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কি কি? এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই হয়তো যে কয়েটি পানীয়র নাম বলবেন তার মধ্যে অন্যতম -চা।
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়র একটি এই চা।
আমাদের চাহিদার কারণে গত তিন শতাব্দীতে এর পাতার ধরণে পরিবর্তন এসেছে বিভিন্ন মহাদেশজুড়ে, কিন্তু এর আবেদন একই রয়ে গেছে।। উটের কাফেলা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিপ্লব – এবং এমনকি পারলৌকিক জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে – চা মানবজাতির জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে।
দুধ চা?
ভারতে প্রচুর পরিমাণে জন্মানো চায়ের উদ্ভিদটি ছিল ক্যামেলিয়া সিনেনসিস অসমিকা নামে একটি উপ-প্রজাতির উদ্ভিদ। গ্রিন টি’র চেয়ে আসাম টি বেশি স্বাদযুক্ত কালো রং-এর ছিল ।
সাধারণভাবে প্রাথমিক ইংলিশ ব্রেকফাস্টের অন্তর্ভুক্ত আসাম চা-এর রং কড়া থাকায় তা লোকজনকে দুধ সহকারে পান করতে প্ররোচিত করেছিল।
বর্তমানে ব্রিটেনে সাধারণ ইংলিশ ব্রেকফাস্ট বা প্রাত:রাশের সাথে দেয়া চা দুধ সহকারে পান করা হয়। কিন্তু ইউরোপ মহাদেশের অন্যান্য স্থানে চায়ের সাথে দুধ খুব কমই পরিবেশন করা হয়।
তার কারণ মূলত, ইন্দোনেশিয়ার জাভা থেকে নেদারল্যান্ডসে চা যেতো – যা ছিল অনেক হালকা এবং তার সাথে দুধ যোগ করার প্রয়োজন হতো না-আর সে বিষয়টি ফ্রান্স, স্পেন এবং জার্মানিতে এই চা জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
চা গবেষক ইসমাইল চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৪৭ সালে এই অঞ্চলে প্রায় ১৮ মিলিয়ন কেজির মতো চা উৎপাদিত হতো। তার প্রায় ১৫ মিলিয়নই রপ্তানি হতো, তিন মিলিয়ন কেজির মতো এখানে খাওয়া হতো। একাত্তর সালে এসে সেই উৎপাদন এসে দাঁড়ায় ৩১ মিলিয়ন কেজিতে। সুতরাং বোঝা যায়, মানুষের মধ্যে চা খাওয়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ছিল, চায়ের উৎপাদনও বাড়ছিল।
চা শিল্পের ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ১৮০০ শতাব্দীর প্রথমভাগে ভারতবর্ষের আসাম ও আশেপাশের এলাকায় চা চাষ শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর তীরে চা আবাদের জন্য ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে জমি বরাদ্দ হয়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেখানে চা চাষ বিলম্বিত হয়।
চট্টগ্রাম শহরে ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান চট্টগ্রাম ক্লাব সংলগ্ন এলাকায় একটি চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা কুণ্ডুদের বাগান নামে পরিচিত। এই বাগানটিও প্রতিষ্ঠার পরপরই বিলুপ্ত হয়ে যায়। অতঃপর ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে মতান্তরে ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট শহরের এয়ারপোর্ট রোডের কাছে মালনিছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত: মালনিছড়াই বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান।
দেশ স্বাধীনের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে শুধুমাত্র দুইটি জেলায় চা আবাদ করা হতো, একটি সিলেট জেলায় যা ‘সুরমা ভ্যালি’ নামে পরিচিত ছিল, আর অপরটি চট্টগ্রাম জেলায় যা ‘হালদা ভ্যালি’ নামে পরিচিত ছিল, যা বর্তমানে চট্টগ্রাম ভ্যালি করা হয়েছে।
খাদ্য বিষয়ক ইতিহাসবিদ এরিকা র্যাপোর্ট তার ‘এ থার্স্ট ফর এমপায়ার: হাউ টি শেপড মডার্ন ওয়ার্ল্ড’ বইতে লিখেছেন, ১৮৩০ সালের দিকে ব্রিটিশরা প্রতি বছর প্রায় ৪০ মিলিয়ন পাউন্ড চা পান করতো। এটা আসতো মূলত চীন থেকে।
কিন্তু ব্রিটিশদের চায়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল আরও আগে থেকে। তখন মূলত চীন থেকে ব্রিটেনে চা আমদানি করা হতো।
অ্যাংলো-ডাচ যুদ্ধের কারণে চীন চায়ের রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর ব্রিটিশরা বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করে।
চা খাওয়ার উপকারিতা
চা খাওয়া শুধুই কি অভ্যাস? নাকি এর স্বাস্থ্য উপকারিতাও রয়েছে? অনেকের ধারণা, চা খাওয়ার কোনো উপকারিতা নেই। আসলে এই ধারণা মোটেই সঠিক নয়। কারণ নিয়মিত চা খেলে পাবেন অনেকগুলো উপকার। সারাদিনের সতেজ অনুভূতির জন্য হলেও এক কাপ চায়ের প্রয়োজন পড়ে। সেইসঙ্গে বাঁচা যায় বিভিন্ন অসুখ থেকেও। চা খাওয়ার অভ্যাস মোটেও ক্ষতিকর নয়। তবে তা খেতে হবে পরিমিত। চলুন জেনে নেওয়া যাক নিয়মিত চা খাওয়ার উপকারিতা-
নার্ভ শান্ত করে
নার্ভ শান্ত করতে কাজ করে চা। এতে থাকা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি করে। যে কারণে চা খেলে নার্ভ শান্ত হয়। পাশাপাশি নিয়মিত চা পান করলে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা যায়। তাই দেখবেন, মানসিক চাপ কমাতে অনেকেই এক কাপ চায়ে নিয়ে বসেন।
ভালো থাকে হার্ট
হার্ট ভালো রাখার জন্য খাবারের তালিকায় নজর রাখতে হবে। প্রতিদিন অন্তত এক কাপ চা আপনাকে এই কাজে সাহায্য করবে। লিকার চায়ে থাকে এমন কিছু এনজাইম, যা আপনার হার্টে রক্ত সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়। ফলে হৃৎপিন্ড সুস্থ থাকে। বিশেষজ্ঞরা দিনে দুইবার লিকা চা খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
মাইগ্রেন কমায়
মাইগ্রেন একবার দেখা দিলে কখনো আর পুরোপুরি সেরে যায় না। এ ধরনের সমস্যা যাদের আছে তাদের খাবারের বিষয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হয়। কারণ কিছু খাবারের কারণে মাইগ্রেন বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে কিছু খাবার মাইগ্রেন কমাতে কাজ করে। তার মধ্যে একটি হলো ল্যাভেন্ডার চা। এটি অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। যে কারণে এই চা খেলে তা মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বাড়িয়ে দেয়। ফলে কমে মাইগ্রেন।
ব্যথা কমায়
শরীরে কোথাও আঘাত পাওয়ার কারণে ব্যথা হতে পারে। এক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করতে পারে মধু চা। যদি আঘাত পাওয়ার কারণে শরীরে কোথাও ব্যথা হয় তবে এক কাপ মধু চা খেয়ে নিন। এতে খুব দ্রুত ব্যথা কমে আসবে। আমাদের শরীরে সৃষ্ট প্রদাহ দূর করতে কাজ করে মধু চা। সেইসঙ্গে ক্ষতস্থানের ফোলাভাব কমাতেও কাজ করে এটি।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
যেকোনো অসুখের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এই কাজে আপনাকে সাহায্য করতে পারে চা। চায়ে থাকা ভিটামিন আপনার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। নিয়মিত চা খেলে আপনি অনেক ধরনের অসুখ থেকে দূরে থাকতে পারবেন।
ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে
মরণঘাতি অসুখ ক্যান্সার থেকে বাঁচতে আপনাকে সাহায্য করবে চা। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে এমনটাই। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত গ্রিন টি খেলে তা শরীরে ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি হতে দেয় না। তাই এই চা প্রতিদিন এক-দুই কাপ খেতে পারেন। এতে ক্যান্সারসহ আরও অনেক অসুখ থেকে দূরে থাকা সম্ভব হবে।