08/02/2026
আম্মু যখন বলে 'খবরদার ফোন ধরবি না!' তখন কেন যেন ফোনের প্রতি মায়াটা আরও বেড়ে যায়, তাই না?
এর পেছনে এক অদ্ভুত সাইকোলজি আছে!
একটু ইন্টারনেট ঘাঁটলেই দেখবেন যে, বারবারা স্ট্রাইস্যান্ড নামক একটা গায়িকা নিজের বাড়ির ছবি লুকাতে চাইলেন, আর হিতে বিপরীত হয়ে ৪ লাখ মানুষ সেই ছবি দেখে ফেলল!
কিংবা রোমিও-জুলিয়েটের প্রেম কি আসলেও এত গভীর ছিল, নাকি বাবা-মায়ের নিষেধই তাদের আগুনের মতো জ্বালিয়ে রেখেছিল?
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, যে কাজটা করতে আপনাকে সবচেয়ে বেশি মানা করা হয়, ঠিক সেই কাজটা করতেই আপনার কেন সবচেয়ে বেশি ইচ্ছা করে?
ধরুন, ক্লাসে স্যার বললেন, "সবাই এই লাল ফাইলটা ছাড়া যা ইচ্ছা দেখো।" দেখবেন আপনার পুরো মনোযোগ তখন ওই লাল ফাইলের ওপরেই আটকে আছে। এটাকে আমরা বলি 'নিষিদ্ধ ফলের নেশা' বা সাইকোলজির ভাষায় 'সাইকোলজিক্যাল রিঅ্যাক্ট্যান্স'।
গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে।
জ্যাকারিয়া ব্রেম নামের এক সাইকোলজিস্ট দেখলেন, মানুষের যখন মনে হয় তার স্বাধীনতা কেউ কেড়ে নিচ্ছে, তখন তার ভেতরে এক ধরনের বিদ্রোহ জন্ম নেয়।
সে নিজেকে প্রমাণ করতে চায় যে সে স্বাধীন। আর এই প্রমাণ দিতে গিয়েই সে সেই নিষিদ্ধ কাজটা আরও বেশি করে করে।
টুইস্টটা শুনবেন?
এই স্বভাবটা আমাদের ভেতরে একদম ছোটবেলা থেকেই থাকে।
১৯৭৭ সালে দুই বছর বয়সী কিছু বাচ্চার ওপর একটা পরীক্ষা চালানো হলো। তাদের সামনে দুটো খেলনা রাখা হলো। একটা ছিল একদম হাতের নাগালে, আর অন্যটা রাখা হলো একটা উঁচু কাঁচের দেয়ালের ওপাশে।
দেখা গেল, বাচ্চারা হাতের কাছের সহজ খেলনাটার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। তারা সবাই ওই কাঁচের দেয়াল টপকে নিষিদ্ধ খেলনাটা ধরার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছে!
অর্থাৎ, কোনো কিছু যখন আমাদের জন্য 'কঠিন' বা 'নিষিদ্ধ' করে দেওয়া হয়, আমাদের মস্তিষ্ক সেটাকে পাওয়ারফুল মনে করতে শুরু করে।
গল্পের পরের টুইস্টটা আরও মজার।
আপনি কি 'স্ট্রাইস্যান্ড ইফেক্ট'-এর নাম শুনেছেন?
২০০৩ সালে গায়িকা বারবারা স্ট্রাইস্যান্ডের ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়ির একটা এরিয়াল ছবি এক ফটোগ্রাফার ওয়েবসাইটে আপলোড করেন।
মজার ব্যাপার হলো, মামলা করার আগে ওই ছবি মাত্র ৬ জন মানুষ দেখেছিল, যার মধ্যে ২ জন ছিল তার নিজের উকিল!
কিন্তু স্ট্রাইস্যান্ড যখন ৫০ মিলিয়ন ডলারের মামলা করে বসলেন এবং চাইলেন কেউ যেন ওই ছবি না দেখে, তখন হিতে বিপরীত হলো।
এক মাসের মধ্যে ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষ ওই ছবি দেখে ফেলল! মানুষ ভাবল - কী আছে ওই ছবিতে যা আমাদের দেখতে মানা করা হচ্ছে?
এই যে নিষেধ করার কারণে কোনো কিছু ভাইরাল হয়ে যাওয়া, এটাই হলো আধুনিক দুনিয়ার সাইকোলজিক্যাল রিঅ্যাক্ট্যান্স।
এবার একটা রোমান্টিক গল্প।
রোমিও-জুলিয়েটের নাম তো শুনেছেন।
সাইকোলজিস্টরা বলেন, তাদের এই অমর প্রেমের পেছনে বড় একটা হাত ছিল তাদের বাবা-মায়ের বিরোধিতার। যখন দুই পরিবার থেকে তাদের মেলামেশা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলো, তখন তাদের মনে হলো তাদের 'ভালোবাসার স্বাধীনতা' কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
ফলে তাদের একে অপরের প্রতি টান কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
এটাকে বলা হয় 'রোমিও-জুলিয়েট ইফেক্ট'।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন আমরা এমন করি?
ব্রেমের থিওরি অনুযায়ী এর চারটা কারণ আছে।
প্রথমত, আমরা আগে থেকেই বিশ্বাস করি আমরা স্বাধীন।
দ্বিতীয়ত, সেই স্বাধীনতা যখন আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়।
তৃতীয়ত, যখন কেউ খুব কড়াভাবে আমাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপায়।
আর চতুর্থত, যখন আমাদের মনে হয় আজ এই কাজটা করতে মানা করলে ভবিষ্যতে হয়তো আরও অনেক কিছুতেই বাধা আসবে।
আদম এবং হাওয়ার সেই নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার গল্পের কথা ভাবুন। জান্নাতের হাজারো ফলের মাঝখানে শুধু একটা গাছের ফলই তাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল কেন?
কারণ একটাই - নিষেধাজ্ঞা।
এখন থেকে যখন দেখবেন সোশ্যাল মিডিয়াতে কোনো কিছু নিয়ে খুব সেন্সরশিপ চলছে বা কেউ আপনাকে কোনো কাজ করতে খুব বেশি চাপ দিচ্ছে, তখন এক মুহূর্ত থামুন।
নিজেকে প্রশ্ন করুন - আপনি কি আসলেও ওই কাজটা করতে চান, নাকি স্রেফ আপনার ভেতরের 'বিদ্রোহী সত্তা' আপনাকে দিয়ে এটা করাচ্ছে?
স্মার্ট হতে চাইলে নিজের ইমোশন কন্ট্রোল করা শিখুন।
অন্যের নিষেধ যেন আপনাকে রোবটের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগান, আবেগকে নয়!