17/08/2026
🎞️ মীনা: আগরপাড়া–সোদপুরের হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক ঠিকানা
"মীনা নামবেন... মীনা!"
একটা সময় বাসের কন্ডাক্টরের এই ডাকটাই ছিল সোদপুর-আগরপাড়ার মানুষের কাছে এক পরিচিত শব্দ। আজ সেই ডাক আর শোনা যায় না। বাসস্টপের নাম বদলে হয়েছে সোদপুর মোড়। কিন্তু যারা মীনার দিনগুলো দেখেছেন, তাঁদের কাছে আজও সেই জায়গার নাম একটাই—মীনা মোড়।
✍️ ঐতিহ্যের পানিহাটী
কংক্রিটের বহুতলের দিকে তাকালে আজও অনেকের চোখে ভেসে ওঠে এক বিশাল সাদা পর্দা। মনে পড়ে যায় সেই লম্বা টিকিটের লাইন, শো শুরুর আগে বাজতে থাকা গান, ইন্টারভ্যালে চায়ের গন্ধ, আর সিনেমা শেষ করে দল বেঁধে বাড়ি ফেরার গল্প। একটা সিনেমা হল কতটা মানুষের জীবনের অংশ হতে পারে, তার উত্তর খুঁজতে গেলে বারবার ফিরে আসতে হয় মীনার কাছে।
মীনা শুধু একটি সিনেমা হল ছিল না, ছিল আগরপাড়া-সোদপুরের সাংস্কৃতিক জীবনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
এই হলের জন্মও এক ভালোবাসার গল্প। আগরপাড়ার বিশিষ্ট শিল্পপতি শিবপ্রসাদ মুখার্জী তাঁর প্রয়াত স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর স্মৃতিকে অমর করে রাখতেই ১৯৪৩ সালে শুরু করেন একটি সিনেমা হল নির্মাণের কাজ। দুই বছরের পরিশ্রমের পর ১৯৪৫ সালে, জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার শুভদিনে, নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ীর উপস্থিতিতে 'পরভৃতিকা' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে উদ্বোধন হয় মীনা সিনেমা হলের। শুরুতে পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বিমল মুখার্জী ও রবীন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, পরে সেই দায়িত্ব নেন সুবোধ রায়। প্রথম অপারেটর ছিলেন রবি ঘোষাল ও সুকুমার দাস। তখন টিকিটের দাম ছিল মাত্র সাড়ে চার আনা থেকে দেড় টাকা। প্রথমদিকে প্রায় ২৮ জন কর্মী কাজ করতেন। পরে সেই সংখ্যা কমলেও মীনার জনপ্রিয়তা কখনও কমেনি। প্রতি রবিবার ছাত্রছাত্রীদের জন্য শিক্ষামূলক সিনেমা প্রদর্শনের ব্যবস্থাও ছিল, যা সেই সময়ের জন্য সত্যিই বিরল উদ্যোগ।
সময়ের সঙ্গে মালিকানা বদলেছে। ১৯৭১ সালে সূর্য্যপাল ও বিনোদ পাল, পরে ১৯৯৩ সালে মহেশতলার রাজু দাস হলটির দায়িত্ব নেন। কিন্তু একটি জিনিস কোনওদিন বদলায়নি—'মীনা' নামটি। কারণ এই নাম তখন আর শুধু একটি সিনেমা হলের নাম ছিল না, ছিল মানুষের আবেগের আরেক নাম।
মীনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো ব্যক্তিগত গল্প।
কেউ ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে প্রথম সিনেমা দেখতে এসেছেন। কেউ কাকিমার সঙ্গে। কেউ আবার বন্ধুদের নিয়ে প্রথমবার বাড়ির অজান্তে ছবি দেখার রোমাঞ্চ উপভোগ করেছেন। কারও প্রথম সিনেমা 'বাদশা', কারও 'কাবুলিওয়ালা', কারও 'সুভাষচন্দ্র'। কেউ এখনও মনে করেন 'গুপী গাইন বাঘা বাইন', 'সন্ন্যাসী রাজা', 'গুরুদক্ষিণা', 'দুই পৃথিবী', 'অমানুষ', 'হীরক রাজার দেশে', 'শুধু একটি বছর' কিংবা 'হিম্মতওয়ালা'-র কথা। ছবির গল্প হয়তো অনেকটাই ভুলে গিয়েছেন, কিন্তু প্রথম বড় পর্দায় ছবি দেখার বিস্ময়টা আজও অমলিন।
হলের ভেতরে ছিল একটি ছোট্ট পোস্ট অফিস। বাইরে ছিল একটি ছোট্ট ক্যাফে। অনেকেই দাঁড়িয়ে দেখতেন, কিন্তু পকেটে কয়েকটা পয়সা না থাকায় ভিতরে ঢোকার সাহস হতো না। গানের বই কিনে বাড়ি ফেরার আনন্দও ছিল আলাদা। আর শো শুরুর আগে যখন লাউডস্পিকারে ভেসে আসত "ও বাবুল প্যারে..." কিংবা "ওহ শাম কুছ আজীব থি...", তখন দর্শকেরা বুঝে যেতেন—আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আলো নিভবে, শুরু হবে স্বপ্নের জগৎ।
ভালো ছবি মুক্তি পেলেই টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ত। 'সন্ন্যাসী রাজা'-র মতো ছবির সময় অনেকেই টানা কয়েক দিন লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট পাননি। শেষ পর্যন্ত ব্ল্যাক টিকিট কিনেই সিনেমা দেখতে হয়েছে। তখন দু-তিন গুণ দাম দিয়েও টিকিট কিনতে মানুষের আপত্তি ছিল না। কারণ সিনেমা মিস করা যাবে না!
আবার অনেকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে খোকাদা। মাত্র এক টাকা দিয়ে তাঁর কাছ থেকে টিকিট কেটে সিনেমা দেখার সেই দিনগুলো আজও অনেকের মুখে মুখে ফেরে।
শুধু নিয়মিত শো নয়, মীনা ছিল সমাজেরও অংশ। বিভিন্ন ক্লাবের উদ্যোগে রবিবার সকালে চ্যারিটি শো আয়োজন করা হতো। কোনও পাড়ার উদ্যোগে বিশেষ প্রদর্শনীও হয়েছে। অনেকেই স্মরণ করেন, তাঁদের পাড়ার উদ্যোগে 'গণদেবতা' সিনেমা দেখানো হয়েছিল। আগের দিন এলাকার কাকু-জ্যেঠুরা নিজেরাই সিনেমার ফিল্মের ক্যান হলে পৌঁছে দিয়েছিলেন। মূল ছবি শুরুর আগে একটি সরকারি তথ্যচিত্র দেখানো হয়েছিল—সেই ছোট্ট ঘটনাটাও আজও মানুষের মনে অমলিন।
মুখার্জী কোম্পানির নামও মীনার ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আগরপাড়ার ইলিয়াস রোডে মুখার্জী কোম্পানির বাড়ি, গ্যারেজ এবং জাঁকজমকপূর্ণ অন্নপূর্ণা পূজা একসময় ছিল এলাকার গর্ব। সেই গৌরবময় অধ্যায়ও আজ অতীতের অংশ।
তারপর একদিন সময় বদলাল। মাল্টিপ্লেক্স এল, শপিং মল এল, মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেল। ধীরে ধীরে নিভে গেল মীনার আলো। একদিন খবর এল—হলটি ভেঙে ফেলা হবে। মানুষ দাঁড়িয়ে দেখলেন, শুধু একটি ভবন নয়, তাঁদের শৈশব, কৈশোর আর অসংখ্য স্মৃতিও যেন ভেঙে পড়ছে। যেখানে একদিন বিশাল পর্দায় হাসি-কান্না ভাগ করে নিয়েছিলেন হাজার মানুষ, সেখানে আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বহুতল আবাসন।
সময় বদলেছে। আজ সিনেমা মোবাইলের পর্দায়, টিকিট অনলাইনে, আর আরামদায়ক আসন মাল্টিপ্লেক্সে। কিন্তু মীনার সেই পরিবেশ—হলভর্তি হাততালি, ইন্টারভ্যালে গল্প, সিনেমা শেষে একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফেরা—এসব কোনও প্রযুক্তিই ফিরিয়ে দিতে পারেনি।
ঐতিহ্যের পানিহাটী দীর্ঘদিন ধরে পানিহাটি ও তার আশপাশের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং গৌরবকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করে চলেছে। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, একটি শহরের প্রকৃত পরিচয় তার মানুষ আর তাদের স্মৃতিতে লুকিয়ে থাকে।
আপনাদের কাছেও আমাদের আন্তরিক আবেদন—মীনা সিনেমা হলকে ঘিরে যদি কোনও স্মৃতি, পুরনো ছবি, টিকিট, পোস্টার বা গল্প থেকে থাকে, আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিন। আপনার একটি ছোট্ট স্মৃতিই হয়তো আগামী দিনের কাছে হয়ে উঠবে ইতিহাসের মূল্যবান দলিল।
মীনা আজ আর নেই। কিন্তু যারা একদিন তার অন্ধকার হলঘরে বসে রূপালি পর্দার আলোয় নিজেদের স্বপ্ন খুঁজে পেয়েছিলেন, তাঁদের হৃদয়ে মীনা আজও জ্বলজ্বল করছে। কিছু জায়গা ভেঙে ফেলা যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি কোনওদিন ভাঙে না।
⚠️ এই লেখাটি অনুমতি ছাড়া কপি বা পুনঃপ্রকাশ করবেন না। শেয়ার করতে পারেন। ⚠️