03/25/2025
২৬শে মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবময় দিন। এই দিনটি স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়, যা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার স্মারক। এটি বাঙালির সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও বিজয়ের প্রতীক। প্রতি বছর, এই দিনটি শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয়, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের স্মরণ করে, যারা স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার শেকড় ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের সময় থেকে গভীরভাবে প্রোথিত। ভারত বিভাগের পর পাকিস্তান গঠিত হয় এবং দুই অংশে বিভক্ত হয়—পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান) এবং পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের শিকার হন।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় যখন ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করে। পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে যখন ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনা করে এবং ঢাকায় হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) শেখ মুজিবুর রহমান এক যুগান্তকারী ভাষণ দেন, যা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণার উৎস। ১৮ মিনিটের এই ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” ইউনেস্কো ২০১৭ সালে এই ভাষণকে “বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
২৫শে মার্চ রাতের গণহত্যার পর, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই স্বাধীনতার আহ্বান জানান। এরপর, ২৬শে মার্চ, ১৯৭১, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমান বেতার ভাষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এই ঘোষণা বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে।
স্বাধীনতার ঘোষণার বিভিন্ন বার্তা চট্টগ্রাম ও অন্যান্য স্থানে বেতার তরঙ্গে প্রচারিত হয়, যার ফলে সারা দেশে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।
নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বহু প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী একসঙ্গে যুদ্ধ করে এবং ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১, পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। এর মাধ্যমে জন্ম নেয় এক স্বাধীন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ।
প্রতি বছর, ২৬শে মার্চ সারাদেশে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও উদ্দীপনার সাথে উদযাপিত হয়। দিনটি ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে শুরু হয়। এরপর জাতীয় স্মৃতিসৌধে (জাতীয় স্মৃতি সৌধ, সাভার) শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সরকারি-বেসরকারি ভবন ও ঘরবাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্যারেড, আলোচনা সভা, চিত্র প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে। রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিবর্গ জাতির উদ্দেশ্যে বাণী প্রদান করেন এবং শহীদদের স্মরণ করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধু একটি ভৌগোলিক মুক্তিই নয়, এটি একটি জাতির গৌরব, আত্মপরিচয় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের ফল। এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে, যা প্রতিটি বাংলাদেশির কাছে গর্বের বিষয়। আজ বাংলাদেশ অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি করছে যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আরও সমৃদ্ধ করছে।
২৬শে মার্চ শুধু স্মরণের দিন নয়, এটি নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের পথে অনুপ্রাণিত করার দিন। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের স্বাধীনতা এসেছে অপরিসীম আত্মত্যাগের মাধ্যমে। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো এই অর্জনকে সম্মান জানানো এবং দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
Alamgir Kabir Sohel
25-03-2025